টাঙ্গাইলে স্কুলশিক্ষার্থীর মুখচ্ছবি ব্যবহার করে পর্নো ভিডিও, টাকা দাবি
Published: 14th, January 2025 GMT
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক মেসেঞ্জারে তিনজনের গ্রুপে একটি পর্নো ভিডিও দেখে হতবাক হয়ে যান এক শিক্ষক মা। শ্বেতাঙ্গ এক নারীর মুখে তাঁর মেয়ের মুখের ছবি ব্যবহার করে ভিডিওটা তৈরি করা হয়েছে। আর এই গ্রুপের তিনজনের একজন তিনি, আরেকজন তাঁর সহকর্মী এবং তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছে ভিডিও প্রেরণকারী। গ্রুপে মেসেজ দিয়ে বলা হয়, ২০ লাখ টাকা না দিলে এই ভিডিও ‘ভাইরাল’ করে দেওয়া হবে। ঘটনাটি ৮ জানুয়ারির টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার। এরপর দুই দিনে বিভিন্ন গ্রুপে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এভাবে ওই উপজেলার ছয় স্কুলশিক্ষার্থী এবং একজন শিক্ষকের স্ত্রীর মুখের ছবি ব্যবহার করে একাধিক পর্নো ভিডিও তৈরি করে বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক পরিবারের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে চারটি ভুক্তভোগী পরিবার থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছেন।
ভূঞাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এ কে এম রেজাউল করিম স্কুলছাত্রীদের ছবি ব্যবহার করে পর্নো ভিডিও করার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গত শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) ভুক্তভোগীদের মধ্যে চারটি পরিবার থানায় এসেছে। তারা জিডি করেছে। এর ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে তিনটি ছেলেমেয়েকে পরিবারসহ থানায় ডেকে আনা হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মুঠোফোন পরীক্ষা করে কিছু পাওয়া যায়নি। এর জন্য ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন। আর এটি করতে হলে মামলা লাগবে। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ‘মানসম্মান হারানোর’ ভয়ে মামলা করতে রাজি নয়। সে ক্ষেত্রে ঘটনাটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কী হবে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘আমরা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নজরে রাখছি।’
যা ঘটেছে
মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্না থামাতে পারছিলেন না এক শিক্ষক মা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে ও মেয়ের দুই সহপাঠী এবং অন্য একটি স্কুলের একই বয়সী মেয়েকে নিয়ে ভিডিও বানিয়ে টাকা চাওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় তাঁর মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তিনি জানান, ৮ জানুয়ারি বুধবার দুপুরে তিনি মেসেঞ্জারের ভিডিও পান। ভিডিও প্রেরণকারীর আইডির নাম ‘Dil Ru Ba’। একটি বিকাশ নম্বর দিয়ে তাঁকে বুধবার রাতের মধ্যেই ২০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। তিনি ওই নম্বরে কল দিলে দেখেন এটি তাঁরই এক সাবেক ছাত্রের নম্বর। এখন সে কলেজ পড়ে। এ ধরনের কোনো ঘটনা সে জানে না বলেও দাবি করে। পরে এই শিক্ষক ভিডিও প্রেরণকারী আইডির কাছে টাকা পাঠানো জন্য ব্যাংকের হিসাব নম্বর চান। জবাবে ওই আইডি এক শিক্ষক দম্পতির মেয়ের কাছে ২০ হাজার টাকা দিয়ে আসতে বলে। এবং ওই মেয়ের কাছ থেকে আরেক ছেলের ফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
ভুক্তভোগী মেয়েটির মা বলেন, সন্দেহভাজন মেয়েটি তাঁর মেয়ের সহপাঠী। সে পুরো ঘটনা অস্বীকার করেছে। তিনি জানান, ৯ জানুয়ারি তিনি ওই আইডির বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আইডিতে যেসব নম্বরে যোগাযোগ করে টাকা দিতে বলা হয়েছিল, সেই নম্বর ব্যবহারকারী ছেলেমেয়েদের পরিবারসহ থানায় ডাকা হয়।
ওই রাতেই সেই আইডি থেকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলে দাবি করেন এই শিক্ষিকা। তিনি বলেন, টাকা না দিলে তাঁরও পর্নো ভিডিও করে ছেড়ে দেবে এবং তাঁর মেয়েদের অ্যাসিড নিক্ষেপ করবে বলে হুমকি দেয়। ১২ জানুয়ারি তাঁকে পর্নো ভিডিও পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর নিজের ও আরেক মেয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে যৌন ‘ব্যবসা’ করেন উল্লেখ করে তাঁর ফোন নম্বরসহ তিনটি ভিডিও গ্রুপে দিয়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী আরেক মা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মেয়ের ছবি দিয়ে পর্নো ভিডিও করে তাঁর কাছে পাঠানো হয় এবং এক লাখ টাকা না দিলে তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়। তবে এটা ‘নোমান’ নামে ভিন্ন আইডি থেকে ভিডিও পাঠানো হয়। তিনিও শুক্রবার থানায় গিয়েছিলেন এবং জিডি করেছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন লিংক ধরে যা পাওয়া গেছে, তাতে ওই তিনটি ছেলেমেয়ে এতে জড়িত বলে মনে হয়েছে।
সন্দেহভাজন তিনজনের মধ্যে দুটির ছেলের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। তবে মেয়েটির মা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মেয়ে এই ঘটনায় জড়িত ছিল না, সেটা থানায় বসে ‘প্রমাণ’ হয়েছে। তিন বছর আগে তাঁর মেয়েকে নিয়েও পর্নো ভিডিও তৈরি করা হয়েছিল। ওই দুটি ছেলে অর্থ আদায়ের জন্য এই কাজগুলো করে। তিনি আরও বলেন, একটি ছেলে থানায় স্বীকারও করেছে, সে ভিডিও বানিয়েছে।
মামলা করতে ভয়
মামলা করলে বিষয়টি আরও জানাজানি হয়ে যাবে, মানসম্মান নষ্ট হবে, এমন আশঙ্কায় মামলা করতে ভয় পাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। মামলা না করা প্রসঙ্গে এক মা বলেন, ‘আপনি–আমি বুঝতে পারছি, এটা ভুয়া ভিডিও। কিন্তু সবাই এভাবে বুঝতে চায় না। এই ভিডিও যদি মেয়ের বিয়ের সময় ছড়িয়ে দেয়! আমার মেয়ের তো জীবন শেষ হয়ে যাবে! ’
শিক্ষক মা বললেন, ১১ জানুয়ারি তিনি পুলিশ সদর দপ্তর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) ফেসবুক পেজে বিশদ জানিয়ে অভিযোগ করেছেন। তাঁর কাছে ভিডিও প্রেরণকারী আইডির লিংক চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই আইডি ডিঅ্যাকটিভেটেড হয়ে আছে।
পিসিএসডব্লিউ এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মামলা ছাড়া প্রতিকার করা কঠিন। কারণ, মামলা না হলে সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার বা ডিভাইস জব্দ করা যায় না। টাঙ্গাইলের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা জিডি করেছেন। পিসিএসডব্লিউ থানার জিডি অনুসন্ধানী কর্মকর্তাকে তথ্যপ্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। আর যে ভুক্তভোগীর মা ফেসবুক পেজে অভিযোগ করেছেন, তাঁর বিষয়টি দেখা হবে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও বলেন, ছবি ব্যবহার করে পর্নো ভিডিও তৈরি করায় মামলাটি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুসারে হবে। এর সঙ্গে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা চাওয়ায় মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০–এর চাঁদাবাজি ধারা যুক্ত হবে।
আইন অনুযায়ী ‘কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তির সামাজিক বা ব্যক্তি মর্যাদাহানি করিলে বা ভয়ভীতির মাধ্যমে অর্থ আদায় বা অন্য কোনো সুবিধা আদায় বা কোন ব্যক্তির জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে ধারণকৃত কোনো পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তিকে মানসিক নির্যাতন করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
মা-বাবার সঙ্গে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ স্কুলছাত্রী
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় মা-বাবার সঙ্গে গোসল করতে নেমে মালিহা (৮) নামের এক শিশু নিখোঁজ হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুর ১টার দিকে নানা বাড়িতে জম্বদ্বীপ খালে গোসল করতে নেমে সে নিখোঁজ হয়।
মালিহা ওই গ্রামের মৃত বাদশা খানের নাতি ও মৎস্যজীবী মো. রাসেলের মেয়ে। সে স্থানীয় জম্বদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী।
জানা যায়, বুধবার দুপুর ১টার দিকে নানা বাড়ির সামনে জম্বদ্বীপ খালে গোসল করতে নামলে জোয়ারের স্রোতে তলিয়ে যায় মালিহা। এ সময় বাবা-মা ও দুই খালা তাকে উদ্ধারে খালে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু তাকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। পরে খবর পেয়ে বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে এসে অভিযান শুরু করলেও তার কোনো সন্ধান পায়নি।
বানারীপাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ষ্টেশনের লিডার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, স্কুলছাত্রীর খালে ডুবে যাওয়ার খবর পেয়ে বরিশালে ডুবুরি দলকে খবর দেওয়া হয়। তারা এসে কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা করেও নিখোঁজ শিশুর কোনো সন্ধান পায়নি। সন্ধ্যা নদী লাগোয় ওই শাখা খালে তীব্র স্রোতের কারণে শিশুটি ভেসে যেতে পারে বলেও তার ধারণা।