আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘মনোবল ঘাটতির’ সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা
Published: 14th, January 2025 GMT
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে। পতিত সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করায় তাদের মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আর এই ‘মনোবল ঘাটতি’কে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে অপরাধীরা।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকারের সামনে যেসব বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে, তার মধ্যে অন্যতম আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বগতি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ফিরে না আসার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। দুটি কারণে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। প্রথমত; দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকেই এসব কাজে যুক্ত হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয় উঠতে পারেনি।
একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মাইনুল হাসান সোহেল। গত ২৪ ডিসেম্বর রাত ৯টার পর টিকাটুলির মোড়ের অফিস থেকে রিকশায় সেগুনবাগিচার ডিআরইউতে যাচ্ছিলেন। রিকশাটি দৈনিক বাংলা মোড়ে আসলে একদল ছিনতাইকারী গতিরোধ করে। এক সময় তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি তারা ছিনিয়ে নেয়।
ভুক্তভোগী এই সাংবাদিক রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘ছিনতাইকারীরা মোবাইল টার্গেট করে আক্রমণ করে। তারা আমার হাত ও পায়ে আঘাত করে। এক পযার্য়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরি। রাস্তায় প্রকাশ্যে ও মতিঝিলের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছিনতাইকারীরা যেভাবে আক্রমণ করেছে, সেক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি হলেও হতে পারত।’’
গত, ৮ জানুয়ারি এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ ছিনতাই হওয়া মোবাইলটি উদ্ধার করতে পারেনি।
মতিঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আমরা শুধু মোবাইল উদ্ধারই নয়, অপরাধীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।’’
শুধু সাংবাদিক নয়, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে শুধু সর্বস্বই খোয়াচ্ছন না, অনেককে জীবন দিতে হয়েছে জনবহুল এই শহরে।
ফ্লাইওভার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন হাফেজ কামরুল হাসান। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে চায় ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইকারীদের বাধা দেওয়ায় তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা হাতে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে বুকে আঘাত করে কামরুলের। ফ্লাইওভারের ওপর লুটিয়ে পড়লে ছিনতাইকারীরা তার কাছে থাকা একটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৭ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। অবশ্য এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
হঠাৎ করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, মিরপুর, খিলগাঁও, হাতিরঝিল, শাহজাহানপুর, হাজারীবাগ, শাহ আলী, এমনকি গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সন্ধ্যা নামতেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইচক্রের সদস্যরা। প্রায়শই গুরুতর আহত, এমনকি প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ছিনতাই মামলা যেসব থানায় বেশি
অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় পুলিশের জনবলে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। পুলিশের সর্বোচ্চ পদ আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার পদে পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বেশি আলোচনায় রয়েছে মোহাম্মদপুর এলাকা।
এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ দিনে ঢাকায় গড়ে তিনটি করে ছিনতাই মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, হাতিরঝিল ও শাহজাহানপুর থানায়। দুটি করে ছিনতাই মামলা হয়েছে হাজারীবাগ, মিরপুর ও শাহআলী থানায়। একটি করে ছিনতাই মামলা হয়েছে ১৬টি থানায়। জানুয়ারিতে ১১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২১টি, মার্চে ১৩৮টি, এপ্রিলে ৯৭টি, মে মাসে ১১৫টি, জুনে ১০৩টি, জুলাইতে ১০১টি এবং আগস্টে ৭০টি ছিনতাই ও ডাকাতির মামলা হয়েছে। এর আগের বছর
জানুয়ারিতে ১০৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭টি, মার্চে ১১১টি, এপ্রিলে ১১৮টি, মে মাসে ৯৫টি, জুনে ১০৫টি, জুলাইতে ৯৪টি, আগস্টে ১০৪টি, সেপ্টেম্বরে ১০৬টি, অক্টোবরে ১০৬টি, নভেম্বরে ৭৯টি এবং ডিসেম্বরে ১০৫টি। মোট ১২২৭। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ৯১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৮৫টি, মার্চে ৯৪টি, এপ্রিলে ১০৭টি, মে মাসে ৮৫টি, জুনে ৮৫টি, জুলাইতে ৯৭টি, আগস্টে ১০৭টি, সেপ্টেম্বরে ১০৯টি, অক্টোবরে ১০২টি, নভেম্বরে ৯২টি এবং ডিসেম্বরে ৭৪টি। সব মিলিয়ে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ছিনতাইকারীর হাতে নিহত হয়েছেন সাতজন। এ ছাড়া অনেকে গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ঢাকার ৫০টি থানা এলাকায় গত ১ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ দিনে অন্তত ৩৪ জন ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মামলা করেছেন। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন প্রায় শতাধিক ভুক্তভোগী। এ সময় একজন ছিনতাইকারীর হাতে নিহত হয়েছেন।
রেহাই পাচ্ছেন না সাংবাদিকরাও
কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ঢাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ রক্ষার্থে খুইয়েছেন ক্যামেরা, মোবাইল, টাকা আর ব্যাগ। গত ১৩ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ফটো সাংবাদিক মো.
১৬ ডিসেম্বর ছুটির দিন সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে থেকে মফিজুল ইসলাম সাদিক নামের একজন সংবাদকর্মীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনতাই হয়ে যায়।
তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘মোবাইলটি ছোঁ মেরে নিয়ে যায় ছিনতাইকারী। আশপাশে চিৎকার করলেও আমার কথা কেউ শোনেনি।’’ পরে অবশ্য মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিনি থানায় জিডি করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ডাকাতি
হাতিরঝিল থানা এলাকায় ডাকাতির ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ নভেম্বর।
মামলার এজাহার বলা হয়, পশ্চিম রামপুরার বাসিন্দা হোসনে আরা বেগমের বাসায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে ছয় ব্যক্তি প্রবেশ করেন। তারা হোসনে আরার স্বামী আবদুল বাশার চৌধুরীকে মারধর করে আলমারিতে রাখা ৪০ হাজার ডলার, নগদ ১১ লাখ টাকা, ১০ ভরি সোনার গয়না লুট করে নিয়ে যায়। ডাকাতির এই ঘটনায় ১ ডিসেম্বর হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে আরেকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর আদাবরে। গত ২৮ নভেম্বর আদাবরের একটি বাসায় গিয়ে ডাকাতেরা চার লাখ টাকার মালামাল লুট করে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করে অভিযান চলছে
ঢাকার ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে, কারা ছিনতাই করে, তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ডিএমপির প্রত্যেক বিভাগের ডিসি, এডিসি ও এসিকে নজরদারি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক রাতে তারা গাড়ি নিয়ে মুভে থাকছেন এবং তদারকি করছেন। এ ছাড়া ডিএমপি কন্ট্রোল রুম থেকে ওয়ারলেসে পেট্রোগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং তারা সজাগ আছে কি না, সেটিও তদারকি করা হচ্ছে। আবার যারা এসব ছিনতাইয়ের কাজে অভ্যস্ত, তাদের আদালতে প্রেরণ করলে তারা অতি সহজেই জামিনে বের হয়ে আসছে এবং আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা মহানগরীতে ২ কোটির মত মানুষের বসবাস। তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এসব ছিনতাইকারী যেন সহজে জামিন না পায়, এজন্য আদালত বা সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করছে পুলিশ।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চেষ্টা করছি ঢাকা শহরে চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির মত ঘটনা যেন না হয়। ইতোমধ্যে ডিএমপির সবগুলো বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তারা ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। গত কয়েকদিনের প্রায় দুই শতাধিকের বেশি ছিনতাইকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ইদানিং মোবাইল ছিনতাই বেড়েছে। মোবাইল ছিনতাই প্রতিরোধেও পুলিশ মোড়ে মোড়ে কাজ করছে। এ ছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেলে মুহূর্তেই ছুটে যাচ্ছে পুলিশ।’’
এদিকে, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি এলিট ফোর্স র্যাবও কাজ করছে। এজন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে র্যাবের ব্যাটেলিয়নের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে ছিনতাই প্রতিরোধে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীম ফেরদৌস রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘সম্প্রতি চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে র্যাব। র্যাবের প্রত্যেকটি ব্যাটালিয়নে সংশ্লিষ্ট এলাকার অপরাধপ্রবণ জায়গাগুলো নির্ধারণ করা হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় কোন সময়ে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বেশি হচ্ছে, সে অনুযায়ী টহল কার্যক্রমসহ চেকপোস্ট বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যরাত এবং ভোরে বাসসহ বিভিন্ন টার্মিনালে যখন যাত্রীরা নামেন, তখন ওইসব এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। ইতোমধ্যে র্যাব বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তারও করেছে।’’
ঢাকা/এনএইচ
উৎস: Risingbd
এছাড়াও পড়ুন:
ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
চলতি মার্চ মাসে দেশে ধর্ষণের সংখ্যা গত ফেব্রুয়ারি মাসের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ধর্ষণ ও হত্যা। মার্চ মাসে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণচেষ্টাসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪২৮টি। আগের মাসে মোট নারী নির্যাতনের ঘটনার এ সংখ্যা অনেকটাই বেশি।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মার্চ মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। আজ সোমবার (৩১ মার্চ) এমএসএফ এ প্রতিবেদন দেয়। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।
এমএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে ১৩২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আর ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৫৭টি। মার্চে দলবদ্ধ ধর্ষণ হয়েছিল ১৭টি, যেটি পরের মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ২৫টিতে। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ফেব্রুয়ারিতে ঘটেছিল ১৯টি আর এ ধরনের ঘটনা মার্চে ঘটে ৬১টি।
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে শিশু ও নারী নির্যাতন বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে । নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে দেশে যথেষ্ট কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকার অভাব, বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতিবাচক দায়িত্ববোধ, ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে অপারগতার ফলে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা যে হারে বেড়ে চলেছে, তা জাতীয় জীবনে অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ বেড়ে অসহনীয় পর্যায়ে যাওয়ায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা বেড়েছে।
এমএসএফ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও শিথিলতার সুযোগে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতির মতো অপরাধের সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। স্পষ্টতই এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
মার্চ মাসে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও পালানোর চেষ্টাকালে মৃত্যু এবং পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা যেমন বেড়েই চলেছে, তেমন বেড়েছে দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিহত হওয়ার ঘটনা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ের আন্দোলনবিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। এ মাসে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার কমলেও তা এখনো উদ্বেগজনক।
রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতমার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বিশেষত রাজনৈতিক নেতাদের নিজদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব অনেক বেড়েছে। বিএনপিরর দলীয় কর্মীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫২টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪৫৯ জন। তাঁদের মধ্যে ১২ জন নিহত এবং ৪৪৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৩ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির, তিনজন আওয়ামী লীগের, এক পথচারী, এক বৃদ্ধ ও এক প্রবাসী রয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মী না হয়েও বিএনপির দলীয় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে উল্লিখিত তিনজন নিহত হন।
সহিংসতার ৫২টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বের ৩৯টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ৬টি, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩টি, বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ঐক্যজোটের সংঘর্ষের ১টি, বিএনপি-এলডিপি সংঘর্ষের ১টি, বিএনপি–জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংঘর্ষের ১টি, জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্বের ১টি ঘটনা ঘটেছে।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন দুজন এবং আহত হয়েছেন ছয়জন। এ ছাড়া এ মাসে দুজন রাজনৈতিক নেতার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদের মধ্যে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত একজন বিএনপির ও একজন আওয়ামী লীগের এবং লাশ উদ্ধার হওয়া দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
গণপিটুনিমার্চ মাসে অন্তত ৩৯টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৩ জন নিহত ও ৫৬ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন ৮ জন। গণপিটুনিতে নিহতের মধ্যে ৭ জন ডাকাত সন্দেহে, ২ জন সন্দেহজনক চুরির অভিযোগে, ১ জন রাজনৈতিক কারণে, ১ জন ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে, ১ জন অতিরিক্ত মদ্যপানের অভিযোগে এবং ১ জনকে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অপরদিকে ১৯ জন ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে, ৪ জন যৌন হয়রানির অভিযোগে, ৪ জন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, ১৪ জন ডাকাতির অভিযোগে এবং সন্দেহজনক চুরি, ছিনতাই এ ধরনের অপরাধজনিত কারণে ১৫ জনকে গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।
এমএসএফ প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া আইনকে নিজ হাতে তুলে নিয়ে নির্যাতন বা গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটিয়ে গুরুতর আহত করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ। এ ক্ষেত্রে গণপিটুনির সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।