প্রকল্পটি যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়
Published: 14th, January 2025 GMT
দেশের মোট জনসংখ্যার পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। সর্বশেষ জনশুমারিই এমন তথ্য বলছে। তার মানে, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বেশি নারী। নারীর অগ্রগতি ও উন্নয়ন ছাড়া এ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও সম্ভব নয়। নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকারের অনেকগুলোর প্রকল্প ‘তথ্য আপা’। এটির মাধ্যমে নারীদের মধ্যে নানা বিষয়ে সচেতনতা তৈরিসহ অনেকগুলো সেবা দেওয়া হয়ে থাকে। দুঃখজনক হচ্ছে, সেই প্রকল্পের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা পাঁচ মাস ধরে বেতন–ভাতা পাচ্ছেন না।
নারীর জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, আইন, কৃষি ও ব্যবসায় সুবিধা দিতে ১৪ বছর আগে শুরু হয়েছিল ‘তথ্য আপা’ প্রকল্প। মেয়াদ বাড়িয়ে তিন বছর ধরে চালু রাখা হচ্ছে প্রকল্পটি। গত বছর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রকল্পটির মেয়াদ আরেক বছর বাড়ানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পের নাম কিছুটা পরিবর্তন করলেও প্রকল্পটির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্নই থাকছে। এখন প্রকল্প চলমান আছে ঠিকই, বেতন নেই কর্মকর্তা–কর্মচারীদের।
‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের বর্তমান জনবল প্রায় দুই হাজার। বেতন বন্ধ থাকায় তাঁরা পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। সংসার খরচের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষার খরচ নিয়ে অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। প্রকল্প পরিচালক ও জাতীয় মহিলা সংস্থার যুগ্ম সচিব শাহনাজ বেগম প্রথম আলোকে বলেন, বাজেট না থাকায় বেতন-ভাতা দেওয়া যাচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী সপ্তাহে অর্থ ছাড় দিতে পারে। এরপর দুই কিস্তিতে বকেয়া বেতন দেওয়া হবে।
আমরা আশা করব, বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় আন্তরিকতার সঙ্গেই দেখবে। দ্রুত অর্থ ছাড়ের পর বেতন পরিশোধেও বিলম্ব হবে না, সেটিই কাম্য।
যুগ্ম সচিব আবার এ–ও জানাচ্ছেন, পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির মেয়াদ আর বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। তেমনটি ঘটলে এতগুলো কর্মকর্তা–কর্মচারীর কী হবে, সেটিও ভাবতে হবে সরকারকে। কারণ, অনেকে প্রকল্পটির সম্ভাবনা দেখে সুযোগ–সুবিধা বিবেচনা করে অন্যান্য সরকারি ছেড়ে এখানে যুক্ত হয়েছিলেন। এখন তাঁদের চাকরির বয়সও নেই। ফলে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের জীবনে বড় ধরনের সংকট নেমে আসবে।
প্রকল্পের তথ্যসেবা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকল্পটি নিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প কর্মকর্তার উদাসীনতা রয়েছে। এমন অভিযোগ ওঠা অবশ্যই হতাশাজনক। গ্রামে গ্রামে দরজায় দরজায় গিয়ে নারীদের সেবা দেওয়া ও জনসচেতনতা তৈরির এ প্রকল্প অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করব, নারী উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটির স্থায়ীকরণ করা যায় কি না, সেই বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে প্রকল্পটিকে আরও সময়োপযোগী ও কার্যকর করা হোক।
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
সারাদিন কাঠফাটা রোদ, রাতে কাঁথামোড়া শীত
চৈত্র মাসে কাঠফাটা রোদই স্বাভাবিক। দিনের বেলায় হচ্ছেও তাই। কিন্তু রাত নামছে ভিন্ন আয়োজনে। যেন পৌষের শীত! সকালে তার রেশ থাকে কুয়াশা হয়ে। এই চিত্র কেবল উত্তরের জেলা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারীতে নয়; দক্ষিণের খুলনা, দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা কুষ্টিয়া, চূয়াডাঙ্গা; সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলাগুলোর চিত্রও তাই।
বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা যায়, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এসব এলাকায় রাতে শীতের আবহ বিরাজ করছে। সকাল ঢেকে থাকছে কুয়াশায়। গতকাল বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায়নি।
ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও বেড়াতে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি সমকালকে বলেন, ঢাকায় ফ্যান ছাড়া ঘুমাতে পারি না। আর গ্রামে এসে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে। ফজরের নামাজের পর কুয়াশা পড়ে। এর আগে এই সময়ে এমন ঘন কুয়াশা খুব একটা দেখা যায়নি। দিনে আবার উল্টো চিত্র; কাঠফাটা গরম।
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আব্দুস সালাম বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চলে কুয়াশার প্রভাব বেশি যাচ্ছে। এর প্রভাবে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় রাতে কনকনে শীতের ভাব থাকে। তবে দিনে তাপমাত্রা বেশি থাকে। এ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বসন্তে শীতের কুয়াশা পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে চৈত্রের এই রূপ। কোথাও বেশি, কোথাও কম। আবার অসময়ে তাপপ্রবাহও শুরু হচ্ছে। এটিকে তারা ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পরিবর্তন বলছেন। তাদের ভাষ্য, জলবায়ু বদলের কারণেই এমনটি হচ্ছে। এই বিরূপ প্রকৃতি উদ্বেগেরও। কারণ এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে গাছগাছালির। বাড়বে ফসলের রোগবালাই।
গতকাল সকালে পঞ্চগড়ের পথঘাটও ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে এমন কুয়াশা তারা দেখেননি। এলাকায় জ্বর, সর্দিসহ নানা রোগের কথাও জানালেন কেউ কেউ।
আবহাওয়া অফিস জানায়, পঞ্চগড়ে গতকাল সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে মঙ্গলবার দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ বলেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আকাশে জমা মেঘ কুয়াশা হয়ে ঝরছে। আবার বাতাসে ধূলিকণা বেশি ও আর্দ্রতা কম থাকছে। আরও কয়েক দিন এমন অবস্থা চলতে পারে বলে জানান তিনি।
দিনাজপুরে কয়েক দিন ধরে দিনের বেলায় রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে। গভীর রাতে বাড়ে ঠান্ডা। নীলফামারীতে দিনের আবহাওয়া অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও শেষ রাতে তাপমাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে।
রাজশাহীর গ্রামাঞ্চল কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, এমন কুয়াশা রাজশাহীর আমের মুকুল ও গুটির জন্য ক্ষতিকর। আমের মুকুলে ‘পাউডারি মিলডিউ’ নামে এক ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। এতে মুকুল ঝরে পড়ছে।
গত সোমবার নোয়াখালীর সুবর্ণচর হঠাৎ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে বলে জানান স্থানীয় লোকজন। মাঝারি ও ঘন কুয়াশায় সামান্য দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। চৈত্র মাসে এমন ঘন কুয়াশায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বোরো চাষিরা। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চাষি মাহফুজুল হক বলেন, এবার চার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। বেশির ভাগ গাছে শীষ বের হয়েছে। হঠাৎ ঘন কুয়াশার কারণে চিন্তায় পড়েছি।
স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছাইফুল আলম জানান, বিভিন্ন এলাকায় এক সপ্তাহ ধরে কুয়াশা পড়ার খবর পাচ্ছি। কুয়াশা দীর্ঘ সময় ধরে পড়লে বোরো ফসল ব্লাস্টে আক্রান্তের আশঙ্কা আছে।
কুয়াশা দেখে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তারা বলছে, বায়ুমণ্ডলে তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত থাকে, ভোরের দিকে শীতল হয়। ওই সময়টায় বাতাস জলীয় বাষ্প ধারণ করতে না পারায় তা কুয়াশা আকারে ভেসে বেড়ায়।
আবহাওয়াবিদরা জানান, কেবল চলতি বছর নয়, গত ১০-১২ বছর মার্চ মাসজুড়েই এমন কুয়াশা থাকছে এবং অসময়ে তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে। এটিকে তারা ‘সিজনাল প্যাটার্ন চেঞ্জ’ (ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পরিবর্তন) বলছেন। এই পরিবর্তনটাকে তারা ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ বলে মনে করছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু : আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের প্রবণতা এবং পরিবর্তন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও নরওয়ের পাঁচজন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ গত ৪৩ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গবেষণাটি করেন। এতে দেখা যায়, প্রতি ঋতুতে তাপমাত্রা আগের তুলনায় বাড়ছে। পাশাপাশি মৌসুমি বায়ু দেরিতে প্রবেশ করায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্ষাকাল পিছিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় মার্চের শেষ সপ্তাহেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুয়াশা দেখা যাচ্ছে, শীত অনুভূত হচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে দূষণকে চিহ্নিত করেন আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, এই কুয়াশা তৈরির পেছনে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্য দায়ী। এবার রাতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আগেই কুয়াশা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আর বাতাস কম থাকায় কুয়াশা সরে যেতে পারছে না। তিনি জানান, এ সময় ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চীনেও কুয়াশা তৈরি হচ্ছে।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, এক সপ্তাহ আগে রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ওইসব জেলার মাটিতে কিছুটা আর্দ্রতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় ভূপৃষ্ঠ কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা হয়েছে। এর মধ্যে হঠাৎ এসব জেলার ঊর্ধ্ব আকাশ দিয়ে গরম বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। শীতকালে যেমন মানুষের মুখ ও নাক থেকে বের হওয়া গরম বাতাস বাইরের শীতল বাতাসের সঙ্গে মিশে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে, ঠিক একইভাবে এখন শীতকালের মতো কুয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও নীলফামারী প্রতিনিধি)