জমি ও গ্যাস সরকারের, ভাড়া তোলেন বিএনপি নেতা
Published: 13th, January 2025 GMT
বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণ ও অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে ভাড়া তোলার অভিযোগ উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়ীয়ারচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা উত্তোলন করে আসছেন। তাঁর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতাকর্মীর প্রায় ৩৫টি বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
জানা যায়, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যাওয়ার পর সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফের নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে তাঁর লোকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাট করে। সে সময় এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। শ্রমিক লীগ নেতা আব্দুল হালিমের রেস্টুরেন্ট, শাহ আলমের ভাতের হোটেল, শহর আলীর ওষুধের দোকান, আহসান উল্লাহর দোকান, জসিম উদ্দিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়। পরে তারা মেঘনা গ্রুপের সিরামিক কারখানার সামনে সওজের জমি দখল করে ১৩টি দোকান নির্মাণ করে। ওই দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়ীরা হোটেল ও চায়ের দোকান গড়ে তোলে। এসব দোকানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে দৈনিক ও মাসভিত্তিক ভাড়া উত্তোলন করছেন আব্দুর রউফ। একটি দোকানে তাঁর ভগ্নিপতি মনির হোসেনও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সেখানে সোনারগাঁ থানা বিএনপির একটি আধাপাকা কার্যালয়ও নির্মাণ করছেন রউফ।
এলাকাবাসী জানান, বিএনপি নেতা রউফের নির্দেশে তাঁর ছোট ভাই জলিল এবং ভাগনে আজিজ ও সেলিমের নেতৃত্বে এসব কাজ হয়ে থাকে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের যানবাহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গেও তারা যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
রউফের ভগ্নিপতি রেস্টুরেন্ট মালিক মনির হোসেন বলেন, রউফ দোকান নির্মাণ করে তাঁকে ব্যবসা করতে দিয়েছেন। তিনি ইজারা নেননি জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে এভাবেই ব্যবসা করছে মানুষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, বিএনপি নেতা রউফ গ্যাসের বিলসহ দৈনিক ৫০০ টাকা করে তাদের কাছ থেকে আদায় করে থাকেন। এখানে ১৩টি দোকান রয়েছে। কেউ দৈনিক, কেউ মাসভিত্তিক ভাড়া দিয়ে থাকেন। অবৈধ হলেও গ্যাস পাওয়ায় তাদের ভালো হয়েছে। এ স্ট্যান্ডের দোকানগুলো ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে গড়ে আড়াই লাখ টাকা তোলা হয়।
অভিযুক্ত সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কোনো জমি দখল করে দোকান নির্মাণ করিনি। জায়গা খালি থাকায় ব্যবসায়ীরা দোকানপাট নির্মাণ করে ব্যবসা করছেন। গ্যাস সংযোগ দিয়ে ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের মেঘনা ঘাট জোনের ম্যানেজার প্রকৌশলী সুরজিত কুমার সাহা বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে তারা ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েছেন। অনুমতি পেলেই অভিযান চালানো হবে।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আলরাজী লিয়ন বলেন, দেশের পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হারে সওজের জমি দখল হয়েছে। শিগগির কাঁচপুর থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।
উৎস: Samakal
এছাড়াও পড়ুন:
‘আর কোনো দিন বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারব না’
‘‘যাওয়ার সময় বাবা বলেছিল, তুই যাবি নে? আমি বলেছিলাম, না বাবা আমার শরীর খারাপ। বমি হচ্ছে, আমি যাব না। বাবা বলেছিল, আর কোনো জায়গায় তোকে নিয়ে যাব না। ওই দিন বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। আর কোনো দিন কথা বলতে পারব না বাবার সঙ্গে। বাবা আমারে কয়ে থুয়ে গেছিল, তুই থাকিস আমি আসবনে।’’
বাবার মরদেহের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল চট্টগ্রামের জাঙ্গালিয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কুষ্টিয়ার আশীষ মন্ডলের ৯ বছরের মেয়ে আনুশকা মন্ডল পরী।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে আশীষের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স কুষ্টিয়া শহরের কুমারগাড়া ঘোষপাড়ায় বাড়িতে পৌঁছালে তার স্বজনেরা আহাজারি করতে থাকেন। তাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য ভিড় করে এলাকাবাসী। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আশীষের স্ত্রী। স্বজনেরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিলেন। সে সময় পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আশীষের শ্বশুর মিহির বিশ্বাস।
আরো পড়ুন:
চট্টগ্রামে সড়কের সেই অংশে লাল পতাকা স্থাপন
মোটরসাইকেলে এক পরিবার, যশোরে বাসের ধাক্কায় শেষ তিনজন
কথা হলে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘‘গত রবিবার (৩০ মার্চ) কুষ্টিয়া থেকে আশীষ তার ভাইয়ের ছেলে দুর্জয়কে নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার জন্য ঢাকায় বোনের বাড়িতে যায়। সেখানে থেকে বোন সাধনা রানী মন্ডল, ভগ্নিপতি দিলীপ কুমার বিশ্বাস, ভাগনি আরাধ্য বিশ্বাসসহ কয়েকজন মাইক্রোবাসে কক্সবাজার যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে আশীষ, তার বোন ও ভগ্নিপতির মৃত্যু হয়।’’ ওই সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ১০ জন মারা যায়।
তিনি বলেন, ‘‘আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আশীষের নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছেছে। এখন কীভাবে চলবে এই পরিবার এই ভেবে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে।’’
স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশীষ মন্ডল স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি কুষ্টিয়া শহরের নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। খুব ছোটবেলায় মামা তাকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলেন। সেই সূত্রে মামা বাড়ির পাশেই জমি কিনে স্থায়ী বসবাস করছেন। নিহত আশীষ মন্ডল কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের মৃত যতীন্দ্রনাথ মন্ডলের ছেলে।
এদিকে, ভাগনেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মামা গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস। কথা হলে তিনি বলেন, ‘‘আশীষের যখন দেড় বছর বয়স, তখন আমি তাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছি। সন্তানের মতো কোলে-পিঠে করে তাকে বড় করেছি।’’
কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছিল আশীষ। বিবাহিত জীবনে তার ৯ বছরের একটি মেয়ে আছে।
ঢাকা/কাঞ্চন/বকুল