মৌলভীবাজারের শেরপুরে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা
Published: 13th, January 2025 GMT
মৌলভীবাজারের শেরপুর এলাকার কুশিয়ারা নদীর তীর ঘেঁষে বসেছে ঐতিহ্যবাহী ‘শেরপুর মাছের মেলা’। পৌষ সংক্রান্তি উৎসব উপলক্ষে রাত-দিনের এ মেলায় বিশাল আকৃতির বিভিন্ন ধরনের মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দূর দূরান্ত থেকে আসা মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
মাছের মেলাকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। গতকাল রবিবার শুরু হওয়া এই মেলা মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত চলবে।
মেলার অয়োজকরা জানিয়েছেন, প্রায় ৩০ একর জমির ওপর মেলা চলছে। মেলায় রয়েছে পাইকারি ও খুচরা মাছ বিক্রেতারা। কোটি টাকার ওপরে এ মেলায় বেচাকেনা হবে বলে আশা করছেন তারা।
আরো পড়ুন:
টাঙ্গাইলে ফাইলা পাগলার মেলা যৌথবাহিনীর অভিযানে বন্ধ
রাজশাহীতে ১০ দিনব্যাপী বিসিক মেলা শুরু
সরেজমিনে গিয়ে ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুশিয়ারা নদীর তীরে প্রায় ২০০ বছর ধরে চলছে এই মেলা। এবারের মেলায় বিভিন্ন আকারের বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, বাঘাইড় (বাঘ মাছ) নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। মেলাটি এখন এলাকার অন্যতম উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মাছ বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, “মেলায় নদী ও হাওরের মাছ নিয়ে এসেছি। নানা বয়সের হাজারো মানুষ আসছেন মাছ কিনতে ও দেখতে। ক্রেতারা তাদের সাধ্যের মধ্যে পছন্দের মাছ কেনার চেষ্টা করছেন।”
মাছ ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী বলেন, “হঠাৎ মাছের দাম কমে যাওয়ায় বেকায়দায় রয়েছি।”
মেলায় আসা ক্রেতা কফিল উদ্দিন বলেন, “এ মেলা আমাদের এলাকার ঐতিহ্য। আমরা প্রতিবছর অপেক্ষায় থাকি কখন মেলা শুরু হবে। কারণ অনেক দুর্লভ মাছ আছে যা একমাত্র এ মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া মেলায় বিভিন্ন ধরনের খাবার হোটেল, তিলুয়া-বাতাসা, খৈ, মুড়ি, নানারকম মৌসুমী ফল পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য থাকে বিনোদনের ব্যবস্থা।”
মেলার ইজারাদার কর্নেল আহমেদ বলেন, “শেরপুর বাজারের আশেপাশের ৫-৬টি গ্রামের মানুষ মিলে আমরা মেলা পরিচালনার জন্য ইজারা নেই। এখানে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা মাছ নিয়ে আসেন। মেলায় ২০ টি পাইকারি দোকান ও ২৫০টি খুচরা মাছের দোকান রয়েছে। প্রায় কোটি টাকার বেশি মাছ বেচাকেনা হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
ঢাকা/আজিজ/মাসুদ
.উৎস: Risingbd
এছাড়াও পড়ুন:
ঈদের দিনটা কেটে যায় কাজে, নিজের জন্য আর কিছুই থাকে না
জীবনের পড়ন্তবেলায় এসে ঈদের উৎসবকে যখন রোমন্থন করি, তখন স্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাই। ছোটবেলায় ঈদ ছিল এক অন্য রকম আনন্দের উৎসব। নতুন জামা বানাতে দরজির দোকানে মাপ দিতে যাওয়া, তারপর নতুন জামা হাতে পাওয়ার পর সেটি লুকিয়ে রাখা, যেন কেউ আগে দেখে না ফেলে! ঈদের দিন সইদের সঙ্গে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো, ভাই–বোনদের সঙ্গে স্টুডিওতে ছবি তুলতে যাওয়া—এসব আনন্দের মুহূর্ত আজও হৃদয়ে জাগরূক। মনে হয়, সময় যেন আটকে গেছে, আমি এখনো সেই শৈশব–কৈশোরের রঙিন দিনগুলোর মধ্যেই আছি। কিন্তু যখন বাস্তবতায় ফিরি, তখন সবকিছু বিমূর্ত হয়ে যায়, ধূসর ও বিবর্ণ মনে হয়। মনের অজান্তেই চোখের কোণে জল এসে জমে।
আমাদের ছোটবেলার ঈদ আজকের মতো জৌলুশময় ছিল না। মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারে ছিল আর্থিক টানাপোড়েন, ছিল পরিমিত জীবনের শিক্ষা। দাদা–দাদার ভাইদের বিশাল পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্না হতো বড় বড় পাতিলে। ঈদের এক সপ্তাহ আগেই শুরু হতো প্রস্তুতি। পুরোনো শাড়ির পাড় জোড়া লাগিয়ে দরজা–জানালার পর্দা বানানো হতো, সোডা দিয়ে কাপড় ধোয়ার আয়োজন চলত। মুড়ি, চিড়া ও খই সংগ্রহ করে রাখা হতো ঈদের সকালে মলিদা তৈরির জন্য। ময়দার সঙ্গে রং মিশিয়ে কাঁঠালপাতায় গোলা লেপে শুকিয়ে বানানো হতো পিঠা। এত কাজ, এত পরিশ্রমের মধ্যেও ক্লান্তি ছিল না; বরং ঈদের প্রস্তুতিই ছিল এক অন্য রকম আনন্দ।
ঈদের দিন ভোরে সাবান দিয়ে গোসল করে নতুন ছাপা থান কাপড়ের ফ্রক পরার আনন্দ আজও মনে পড়ে। তারপর পরিবারের মুরব্বিদের সালাম করে বয়সভেদে চার আনা থেকে এক টাকা পর্যন্ত ঈদের সালামি পাওয়া ছিল আমাদের কাছে বিরাট প্রাপ্তি! ঈদের সকালের শুরু হতো মলিদা দিয়ে, এরপর গুড়ের পায়েস কিংবা গুড়ের সেমাই। দুপুরের খাবারে থাকত মুরগির মাংস আর আলুর ঝোল, যার স্বাদ আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন।
তারুণ্যে পা রাখার পর ঈদের উৎসব বদলে গেল। বরিশালে পড়াশোনার সময় ঈদ পায় নতুন রূপ—সেমাই, ফিরনি, জর্দা, পোলাও–কোরমার ভিড়ে ঈদ যেন ভোজন উৎসবে পরিণত হলো। এরপর কর্মজীবন, বিয়ে ও সংসারের দায়িত্ব এসে ঈদের রং পাল্টে দিল। নারীদের জন্য ঈদ মানে তখন শুধুই স্বামী–সন্তান ও সংসারের তাগিদ।
আজকের ঈদ আর আমাদের শৈশবের ঈদের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। একসময় ঈদ মানে ছিল সীমিত সম্পদের মধ্যেও অপরিসীম আনন্দ। এখন ঈদের বাহারি আয়োজন, নতুন কাপড়–গয়না, খাবারের জৌলুশ বেড়েছে; কিন্তু সেই আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! আগে একটা সাধারণ ফ্রকেই যে আনন্দ লুকিয়ে ছিল, এখন অসংখ্য পোশাকের মধ্যেও তা খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, নারীদের ঈদ শুরু হয় গভীর রাতে—ফিরনি, সেমাই, হালিম, জর্দা, চটপটিসহ বাহারি রান্নার আয়োজন করে। সকালে রান্নার কাজ শেষ হতেই দুপুরের ও রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে ঈদের দিনটাই কেটে যায় কাজে, নিজের জন্য কিছুই আর থাকে না।
অধ্যাপক শাহ্ সাজেদা