সম্প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষাধারার সংস্কারকৃত তথা পরিমার্জিত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। সীমিত কয়েকটি ক্লাসে সীমিত সংখ্যক বই বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনলাইনে বইগুলোর পিডিএফ কপি প্রকাশ করেছে। বইগুলো নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কটি মূলত বইগুলোর সংস্কার বা পরিমার্জন নিয়ে। জাতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্ক হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষত যার সঙ্গে কোটি কোটি শিশু-কিশোরের এবং একই সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। আর বাংলাদেশের মানুষ এখন শিক্ষা বিষয়ে সচেতন ও খানিকটা স্পর্শকাতরও। কৌতুক করে বলা হয়, শ্রীলঙ্কার শতভাগ মানুষ শিক্ষিত আর বাংলাদেশের শতভাগ মানুষ শিক্ষাবিদ। 

রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর রাষ্ট্রের শিক্ষা রাষ্ট্রের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র রাজাশাসিত, সে রাষ্ট্রের সত্য রাজার উৎপাদিত সত্যের সম্পর্কিত হয়েছে। ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে যেমন শিক্ষামন্ত্রী বলেন, হিতাহিতের বিচার করেন কে? রাজা। আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রে অবশ্য শিক্ষা রাজার সে হস্তক্ষেপের অনেকটাই বাইরে। শিক্ষা একাডেমিক স্বাধীনতা ভোগ করে। 

১৮১৩ সালের আগে পর্যন্ত বাংলা অঞ্চলের শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রের বা শাসক শ্রেণির খুব বেশি ভূমিকা ছিল না। ওই বছর শিক্ষায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমবারের মতো এক লাখ টাকা বরাদ্দ করে। তখন শিক্ষায় শাসক শ্রেণির হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর পরিসমাপ্তি ঘটে কুখ্যাত ঔপনিবেশিক কেরানি তৈরির মেকলে নীতি গ্রহণের ভেতর দিয়ে। এ অঞ্চলে পাঠ্যপুস্তকের উন্নয়নও সে সময়েই ঘটে। স্কুল বুক সোসাইটির মাধ্যমে। পাঠ্যপুস্তক রচনায় যুক্ত হন বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীরা। 

বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড মূলত স্কুল বুক সোসাইটিরই উত্তরাধিকার। প্রতিবছর এ প্রতিষ্ঠানটি দেশের মূলধারার শিক্ষার উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ব্যবস্থার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে থাকে। এ বছরও তাই করেছে। তবে এ বছরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। 

২০২১ সালে তৎকালীন সরকার অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করে। এর ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণিতে পাঠ্যপুস্তকও প্রণীত হয়। তখন সেসব পাঠ্যপুস্তকের শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও ব্যাপক বিতর্ক ওঠে। কিন্তু প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক আগের ধারায় থাকায় এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল ও শিক্ষা সংস্কারের দাবি ওঠে। তখন অন্তর্বর্তী সরকার সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে মাধ্যমিকে ২০১২ সালে প্রণীত পাঠ্যপুস্তকগুলো ফিরিয়ে আনা ও প্রাথমিকে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকগুলো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অবশ্য প্রকাশের আগে বইগুলো সংস্কার তথা পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে সরকার একটি কমিটিও গঠন করে, যদিও কমিটির কয়েকজন সদস্য নিয়ে একটি পক্ষের ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মুখে সে কমিটি বাতিল হয়। তারপর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই বইগুলো পরিমার্জন করা হয়। কাদের দিয়ে কী কী পরিমার্জন করা হচ্ছে, তা ঘোষণা করা হয়নি। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়।

পরিমার্জিত বইগুলোর টাইটেল পৃষ্ঠাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, প্রণয়নকারী হিসেবে প্রথম পরীক্ষামূলক সংস্করণের লেখকবৃন্দের নামই রয়েছে। কিন্তু বিয়োজন-সংযোজন-পরিমার্জনের কাজগুলো কারা করেছেন, তা টাইটেল পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়নি; যা করা সমীচীন ছিল।  

প্রাথমিক পাঠে মনে হচ্ছে– পরিবর্তনগুলো মূলত ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে। প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তকে জাতীয় সংগীত শুরুতেই ছিল। তা পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দাবির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। বিগত সরকারের দাবি অনুসারে পাঠ্যপুস্তকে যে বয়ান ছিল, তা বদলে এবার অন্য পক্ষের বয়ানটি এসেছে। বিষয়টি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক। শিক্ষাবিদদের মতামত দেওয়ার বিশেষ সুযোগ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে নতুন যে সংকট সৃষ্টি হতে পারে, একটি ব্যবস্থার পরবর্তী ক্লাসে শিক্ষার্থীরা দু’রকম তথ্যের মুখোমুখি হবে। তারা আগের ক্লাসে যে তথ্য শিখে এসেছে, তার সঙ্গে নতুন তথ্য সাংঘর্ষিক মনে হবে। একই শিক্ষাব্যবস্থা তাদের দু’রকম তথ্য প্রদান করছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় দিক হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মওলানা ভাসানীসহ আরও বড় বড় ব্যক্তির অবদানও যুক্ত করা হয়েছে। যুক্ত করা হয়েছে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পাঠ ও গ্রাফিতি। পাঠ্যপুস্তকের প্রতিটি বিষয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এ বিয়োজন ও সংযোজন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট বা সাযুজ্য রেখে করা হয়েছে কিনা, জানা যায়নি।  
পাঠ্যপুস্তকের এ প্রসঙ্গগুলো বিষয়বস্তুগত। কিন্তু শিখন শিখানো ও মূল্যায়নগত প্রসঙ্গও আলাপের অপেক্ষা রাখে। 

এসব পাঠ্যপুস্তক ক্লাসে পড়ানোর জন্য শিক্ষাক্রমে ১৬৫-১৮৫টি ক্লাস রাখা আছে। পরিমার্জিত পাঠ্যপুস্তকগুলো সব ক্লাসে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ক্লাসে পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস লাগবে– অনুমান করা যাচ্ছে। এতে শিখন সময়ের ঘাটতি তৈরি হবে। শিশু শ্রেণি বাদে বর্তমান শিক্ষার্থীরা এমনিতেই শিখন ঘাটতিতে আছে। করোনার ঘাটতি কাটানো সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৪-এর আন্দোলনজনি ত শিখন ঘাটতি। স্কুলে শিখন পবিবেশও নষ্ট হয়েছে। বিশেষত শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক। এটা স্বাভাবিক করতেও সময় লাগবে। সময় লাগবে সব শিক্ষার্থীর ক্লাসে ফিরে যেতে। ২০১২ সালের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে সৃজনশীল মূল্যায়ন যুক্ত রয়েছে। এখন মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলের কারণে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা পাঠ্যপুস্তক ব্যবহারে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। স্বল্প সময়ে শিক্ষক সংস্করণও করা সম্ভব হবে না। সর্বোপরি আগামী বছর আবার নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হবে; এসব পাঠ্যপুস্তকও বদলে যাবে– এ চিন্তা শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবার মনেই অনিশ্চয়তাবোধ সৃষ্টি করবে। 

শিক্ষাক্রম উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। তবে পরিবর্তনগুলো করতে হবে যুক্তির সঙ্গে। শিক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যুগুলো যত কম জড়ানো যায়, তত ভালো। বিশেষত অমীমাংসিত রাজনৈতিক বিষয়। ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বহির্ভূত বিষয়বস্তু (যাকে শিক্ষা পরিভাষায় বলা হয় ক্রস কাটিং ইস্যুজ) রাখার যুক্তি খুব সবল নয়। রাজনৈতিক বিষয়গুলো থাকবে ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে; ধর্মীয় বিষয়গুলো নিজ নিজ ধর্মের পাঠ্যপুস্তকে– এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। আর কাজগুলো সব সময় করাতে হবে অভিজ্ঞ ও পেশাদার শিক্ষাবিদ নিয়ে।

শিক্ষাক্রমের যে কোনো পরিবর্তন সাধন করতে হয় সতর্কতার সঙ্গে, ধীরে ধীরে। একসঙ্গে বড় আকারের পরিবর্তন সাধন করলে কী বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে, তার প্রমাণ বিগত সরকারের মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ঘটনা থেকে দেখা গেছে। এটা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। 
এবারের নতুন বইগুলোর প্রকাশনার মান অপেক্ষাকৃত ভালো। কাগজ, মুদ্রণের মান– সবদিক থেকেই। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এখন এ বইগুলো দ্রুত সব শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আসছে বছরে শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে ভালো বই হাতে পাক– শিক্ষাজনের এটাই কামনা। 

ড.

শোয়াইব জিবরান: কবি, লেখক; সাবেক সদস্য, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন কমিটি 

উৎস: Samakal

এছাড়াও পড়ুন:

সংসদের আগেই গণপরিষদ নির্বাচন যে কারণে দরকার

নতুন নির্বাচিত সংসদই সংবিধানের সংশোধন করবে বলে গণপরিষদ নির্বাচনের দরকার নেই– এই কথা বলে প্রথাগত রাজনীতিবিদরা প্রকারান্তরে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। সংসদই মাতৃপ্রতিষ্ঠান; গণপরিষদ নয়– এসব বলার কারণ দেশে ’৯১ সাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থার নামে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র চালু ছিল। সংসদীয় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র আসলে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে। কারণ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনের জোরে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করে ফেলা যায়; সেখানে গণভোটের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌমত্বের বদলে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। বিরোধটা এখানেই।

সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনে গণভোটের ব্যবস্থা না রেখে এবং জনগণের সঙ্গে সংলাপ ছাড়াই একটা রাজনৈতিক কাঠামো চাপিয়ে দিয়ে তাকেই দেশের শাসনতন্ত্র বলা অগণতান্ত্রিক। সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্বের কথা বলে জনগণকে শোষণ করার জন্যই নানা আইন পাসের সংসদীয় কাঠামো বাস্তবে জনগণের মৌলিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় কাজ করে না। তাই দরকার গণসার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে জনগণ প্রতিনিধি (সংসদ সদস্য) নির্বাচনের পরও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোট দিয়ে সংসদকে জবাবদিহি রাখবে। আবার এখন যেহেতু ডিজিটাল পদ্ধতি, স্মার্ট ফোন আছে, জনগণ অনলাইন ভোটের মাধ্যমেও মতামত প্রকাশ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি অংশ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতিও নির্বাচিত হবেন জনগণের সরাসরি ভোটে। এভাবেই জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই আমূল পরিবর্তনের জন্য দরকার গণপরিষদ নির্বাচন বা সংবিধান সভা নির্বাচন। এই পরিষদ বা সভার কাজ হবে দেশের সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে জনতার মতামত নিয়ে নতুন গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করা। 

এ ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি যেমন রাজনৈতিক কাঠামো কীভাবে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক হবে; আবার জনগণের মর্যাদা, অধিকার, বিকাশ ত্বরান্বিত করবে; সরকার পদ্ধতি কেমন হবে; সব ধরনের বৈষম্য কীভাবে কমিয়ে আনা যাবে; রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মাঝে ক্ষমতার বণ্টন ও ভারসাম্য; রাজনৈতিক দল গঠন ও নিবন্ধন নীতিমালা কেমন হলে সবার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে– এসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের ভিত্তিতেই গঠনতন্ত্র বা সংবিধানের খসড়া তৈরি হবে। তারপর গণভোটে এই খসড়া পাস হলেই তাকে নতুন সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে এর ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচন দিতে হবে। 

কারণ সংসদের ভিত্তিতে সরকার গঠনের নির্বাচন আর গণপরিষদ নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা। সংসদ গঠিত হয় সংবিধানের ভিত্তিতে এবং সংসদ সেই গঠনতন্ত্রকে রক্ষার শপথ নিয়েই কাজ শুরু করে। সংসদ নির্বাচনের আইন, আসনের সীমানা, সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি এসবও সংবিধানের ভিত্তিতেই ঠিক হয়। গণপরিষদ নির্বাচন হয় সেই সংবিধান প্রণয়নের জন্য। ফলে সংসদ নির্বাচনের আগে দরকার গণপরিষদ নির্বাচন।

অনেকেই মনে করেন, আমাদের নতুন সংবিধান দরকার নেই। বিদ্যমান সংবিধানে কিছু ঘষামাজা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সরাসরি সংসদ নির্বাচন দিয়ে সরকার গঠন করলেই আমাদের এখনকার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটা আসলে রাজনীতি বিজ্ঞান এবং আধুনিক বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কে কম বোঝাপড়ার কারণে হতে পারে। সংসদ নির্বাচন হচ্ছে সরকার গঠনের মামলা; তারও আগে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন না করে সরকার গঠন করলে লাভ নেই। পুলিশ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার দরকার। সে ক্ষেত্রে নতুন সংবিধানের বিকল্প নেই। আর নতুন সংবিধানের জন্য প্রয়োজন গণপরিষদ নির্বাচন। 

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মূল কথা গণমালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তির বিকাশকে কীভাবে আইনে, সংবিধানে, প্রশাসনিক কাঠামোতে এবং রাজনীতিতে রূপান্তর করা হবেম তা এই অন্তর্বর্তী সময়েই সুরাহা করতে হবে। ঔপনিবেশিক আইনসহ নানা নিবর্তনমূলক গণঅধিকার হরণকারী আইন ও সিস্টেম চালু রেখে সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামোতে অনন্তকালীন জরুরি অবস্থা জারি রাখার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু আছে, তা নতুন গঠনতন্ত্র ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়। এসব আইন ও ব্যবস্থাই বারবার বাকশাল, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র, সংসদীয় ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি বলেই রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় সামন্তবাদী কাঠামোতে ভরা। বুর্জোয়া রাষ্ট্র গঠনে যে নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রয়োজন, সে জন্যই প্রথমে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে গঠিত সংসদ সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করতে পারবে না; এটা আইনি ও রাষ্ট্রনৈতিকভাবে সম্ভবও নয়। ফলে সংসদ নির্বাচন করে সংবিধান সংশোধনের আলাপ আসলে নতুন ফাঁদ। 
অনেকেই বলছেন, গণপরিষদ নির্বাচন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দরকার হয় রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ অথবা বিপ্লবী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অথবা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর। তাদের মতে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর যে সংবিধান রচিত হয়েছে তাই যথেষ্ট। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সংবিধানের জন্য তাই গণপরিষদ নির্বাচনের উপযোগিতা নেই। কিন্তু ঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভিত্তিতে রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে তো ‘রাষ্ট্র’ বলা যায় না! এই রাষ্ট্রে গণসার্বভৌমত্ব নেই। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দাবিই হচ্ছে জননিপীড়নমূলক কাঠামোর খোলনলচে পাল্টে ফেলে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। এই কাজ গত ৫৩ বছরে হয়নি; এখন আমাদেরই করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর গণপরিষদ নির্বাচনের বিকল্প নেই।

বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে, যে কোনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরে নতুন সংবিধান প্রয়োজন হয়। ইতালিতে তাই ১৯৪৬ সালে গণপরিষদ নির্বাচন হয় এবং নির্বাচিত সংবিধান সভা গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের পরই সরকার গঠনের নির্বাচন দেয়। চিলিতে ২০১৮ সালের গণআন্দোলনের সব অংশীদার একমত হন– বিদ্যমান সংবিধান সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্য ও অধিকার হরণ ঠেকাতে পারছে না; তা বাতিল করে নতুন সংবিধান তৈরি করতে হবে। ফলে ২০২১ সালে সেখানে গণপরিষদ নির্বাচন হয় এবং সংবিধান সভা নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরি করে। চিলি যদি নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে পারে, আমরা পারব না কেন?

ড. যোবায়ের আল মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • ঋণের দায় ও ঝুঁকি কমানোর কৌশল খুঁজছে সরকার
  • সংসদের আগেই গণপরিষদ নির্বাচন যে কারণে দরকার