ঘরের মাঠে জাকিরের ব্যাটে রান, জয়ের ধারায় সিলেট
Published: 12th, January 2025 GMT
ঢাকা পর্বে একটি ম্যাচই খেলেছে সিলেট স্ট্রাইকার্স। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সেই ম্যাচে ওপেনার রনি তালুকদারের ৩৬ বলে ৪১ রান ছাড়া তেমন কিছু করতে পারেননি সিলেটের আর কোনো ব্যাটসম্যান। তবে ঘরের মাঠে ফিরেই রান পেতে শুরু করেছে দলটির ব্যাটসম্যানরা। বিশেষ করে জাকির হাসান। জাকির রান পেতে শুরু করেছেন, সিলেটও ফিরেছে জয়ের ধারায়।
সিলেট পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ফিফটি পেয়েছেন জাকির, ফিফটি পেয়েছেন রনিও। সেই ম্যাচে ৪ উইকেটে ২০৫ রান করেও অবশ্য ৮ উইকেটে হেরেছে সিলেট। ঘরের মাঠে দ্বিতীয় ম্যাচে আবার তেমন রান পাননি সিলেটের ব্যাটসম্যানরা, বরিশালের কাছে সিলেটও হেরেছে। পরের ম্যাচে জাকিরের ফিফটিতে (২৭ বলে ৫৮ রান) ঢাকাকে হারিয়েছে সিলেট। আজ আবার ফিফটি করেছেন জাকির। ৪৬ বলে ৩ চার ও ৬ ছক্কায় তাঁর অপরাজিত ৭৫ রানের ইনিংসের সৌজন্যেই খুলনা টাইগার্সের বিপক্ষে সিলেট জিতেছে ৮ রানে।
টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে রনি (৪৪ বলে ৫ চার ও ২ ছয়ে ৫৬ রান) ও জাকিরের ফিফটিতে ৫ উইকেটে ১৮২ রান তোলে সিলেট। ১৫ রানের মধ্যে সিলেট ২ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর তৃতীয় উইকেট জুটিতে রনি ও জাকির মিলে ৬১ বলে তোলেন ১০৬ রান। এ জুটিই মূলক ম্যাচটি জিতিয়েছেন সিলেটকে।
রান তাড়া করতে নেমে ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৭৪ রান তুলতে পারে খুলনা। রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি দলটির, ১৭ রানে প্রথম উইকেট হারায় তারা। খুলনা ২৪ রানে দ্বিতীয় আর ৪৭ রানে তৃতীয় উইকেট হারানোর পর গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু চতুর্থ উইকেটে উইলিয়াম বোসিস্টো ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের ৩৩ বলে ৩৪ রানের জুটি কিছুটা হলেও সিলেটের সমর্থকদের উল্লাসে ভাটা আনে। কিন্তু ১৭ রানের মধ্যে এ দুজনই ফিরে গেলে ৫ উইকেটে ৯৮ রান হয়ে যায় খুলনা।
সিলেটের তখন ৪০ বলে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৮৫ রান। ম্যাচটা সামান্য হলেও সিলেটের দিকেই ঝুঁকে ছিল। সেটা খুলনার দিকে অনেকটাই নিয়ে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ নেওয়াজ ও মাহিদুল ইসলাম। ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ১৭ বলে ৩২ রান করেন তাঁরা। জুটি ভাঙে তানজিম হাসানের বলে নেওয়াজের আউটে। আউট হয়ে ফেরার সময় তানজিমের সঙ্গে একটু কথা-কাটাকাটিও হয় নেওয়াজের। এই তর্কের কারণ উইকেট পাওয়ার পর তানজিমের উদ্দাম উদ্যাপন। আর তানজিমের অমন উদ্যাপনের কারণ আউট হওয়ার আগে তাঁর এক ওভারে এক ছয় ও দুই চারে ১৭ রান নিয়েছিলেন নেওয়াজ।
নেওয়াজের আউটের পরও খুলনাকে জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন আবু হায়দার। শেষ ওভারে খুলনার জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৯ রান। মাহিদুল প্রথম বলে সিঙ্গেল নিলে স্ট্রাইক পান আবু হায়দার। টানা দুটি চার মারেন তিনি। খুলনার তখন ৩ বলে ১০ রানের। কিন্তু রুয়েল মিয়ার চতুর্থ বলে ছক্কা মারতে গিয়ে সীমানার কাছে ক্যাচ হয়ে ফেরেন আবু হায়দার। পরের বলে মাহিদুল হন রানআউট। শেষ বলে নাসুম ১ রান নিলে ৮ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সিলেট।
সিলেটের এটা টানা দ্বিতীয় জয়। সব মিলিয়ে ৫ ম্যাচ খেলে দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে সাত দলের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে আছে সিলেট। চার ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে খুলনা আছে চারে।
৬ ম্যাচের সব কটি জিতে ১২ পয়েন্ট নিয়ে সবার ওপরে রংপুর রাইডার্স। ৫ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে ফরচুন বরিশাল আছে দ্বিতীয় স্থানে।
উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল
পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দু’জনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবিলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তাঁর কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন।
আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এই নীতিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।
হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও গবেষক