জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওয়েবসাইটে ঢুকে তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি ভার্সনের ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ’ বইটি ডাউনলোড করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

আজ রোববার বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটে বইটির অনলাইন ভার্সন বা পিডিএফ ডাউনলোড করার চেষ্টা করা হয়। তখন ডাউনলোড না হয়ে ইংরেজিতে লেখা একটি বার্তা আসতে দেখা যায়।

বার্তাটির মূল কথা হলো, এই মুহূর্তে ফাইলটি ডাউনলোড করতে পারবেন না। সম্প্রতি অনেক ব্যবহারকারী এই ফাইলটি দেখেছেন বা ডাউনলোড করেছেন। এ জন্য পরে আবার চেষ্টা করার কথা বলা হচ্ছে বার্তায়।

বেলা তিনটার দিকে নবম-দশম শ্রেণির পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইটি ডাউনলোড করতে গিয়ে একই সমস্যা ও একই ধরনের বার্তা দেখা যায়। অবশ্য কিছু কিছু বই সহজেই ডাউনলোড করা যাচ্ছে।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থী বলছেন, এ রকম সমস্যার কারণে তাঁরা তাঁদের সময়মতো বই ডাউনলোড করতে পারছেন না। ফলে সমস্যায় পড়ছেন।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই বিনা মূল্যে দেয় সরকার। এই কাজটি করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

বছরের শুরুতেই বই হাতে পাওয়ার কথা শিক্ষার্থীদের। কিন্তু এবার বিশেষ পরিস্থিতির কারণে পাঠ্যবই ছাপার কাজ দেরিতে শুরু হয়। এ কারণে এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলোয় সব শিক্ষার্থীর হাতে সব নতুন বই তুলে দিতে পারেনি সরকারি প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থী আগামী মাসের (ফেব্রুয়ারি) মধ্যে সব পাঠ্যবই পাবে। এ রকম পরিস্থিতিতে এনসিটিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া পাঠ্যবইয়ের পিডিএফ ভার্সনের ওপর অনেকে নির্ভর করছে। কিন্তু সেখানে পাঠ্যবই ডাউন করতে অসুবিধায় পড়ছেন অনেকে।

শিক্ষক-অভিভাবকেরা বলছেন, এই সমস্যা যত দীর্ঘ হবে, পড়াশোনার সমস্যাও তত দীর্ঘ হবে।

এ বিষয়ে কথা হয় এনসিটিবির তথ্য ও প্রযুক্তি (আইটি) শাখার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনিও সমস্যাটির কথা স্বীকার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা পিডিএফ ভার্সনটি গুগল ড্রাইভে আপলোড করেছেন। আগের বছরগুলোয়ও এভাবে করেছেন। কিন্তু তখন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবার সমস্যা হওয়ায় তাঁরা বিকল্প আরেকটি উপায়ও রেখেছেন। সেটি হলো, পিডিএফের প্রিন্ট অপশনে গিয়ে ডাউনলোড করা।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিকল্প কিছু ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু পাঠ্যবইগুলো আরও সহজে কীভাবে ডাউনলোড করা যায়, সেই চেষ্টা করছেন।

১ জানুয়ারি শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। এনসিটিবি সূত্রমতে, নতুন শিক্ষাবর্ষে চার কোটির মতো শিক্ষার্থীর জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৪১ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিকের মোট পাঠ্যবই ৯ কোটি ৬৪ লাখের মতো। মাধ্যমিকে (মাদ্রাসার ইবতেদায়িসহ) বইয়ের সংখ্যা ৩০ কোটি ৯৬ লাখের মতো।

কিন্তু এবার পাঠ্যবই ছাপায় দেরি হওয়ায় এখনো শিক্ষার্থীরা সব বই হাতে পায়নি। এমনকি কোনো কোনো শিক্ষার্থী একটি বইও হাতে পায়নি। যেমন—আজ রাজধানীর বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ইংরেজি ভার্সনের পাঠ্যবই এখনো যায়নি।

একদিকে সব শিক্ষার্থী এখনো পাঠ্যবই পায়নি, অন্যদিকে ওয়েবসাইটে পাঠ্যবইয়ের পিডিএফ ভার্সন ডাউনলোড করতে সমস্যার প্রভাব পড়াশোনার ওপর প্রভাব পড়ছে।

অভিভাবক-শিক্ষকেরা বলছেন, বই দিতে যত দেরি হবে সমস্যাটি তত দীর্ঘ হবে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি বৈষম্যের আশঙ্কাও আছে। কারণ, বই ডাউনলোড করে তা প্রিন্ট করার ক্ষেত্রে খরচের একটা ব্যাপার আছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব সব শিক্ষার্থীর হাতে সব পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হবে সবচেয়ে ভালো কাজ।

আরও পড়ুনসব পাঠ্যবই পেতে অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে০৭ জানুয়ারি ২০২৫

এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, আগের বছরগুলোয় অধিকাংশ পাঠ্যবই বছরের শুরুতেই বিদ্যালয়গুলোতে চলে যেত। তখন শিক্ষার্থীরা বই হাতে পাওয়ায় পিডিএফ ভার্সনের জন্য এত চাপ ছিল না। কিন্তু এবার পাঠ্যবই হাতে পেতে দেরি হওয়ায় পিডিএফ ভার্সনের জন্য অনেকে চেষ্টা করছেন। এ কারণে সমস্যা হচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা।

এনসিটিবির আইটি শাখার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, ডাউনলোডের ক্ষেত্রে কোনো সংখ্যা তাঁরা সীমাবদ্ধ করে দেননি।

এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক অনিন্দ্য ইকবালের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনিও এই সমস্যাটি দেখেছেন। ক্লাস শুরু হওয়ার ১০ দিন পার হওয়ার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী বই ডাউনলোড করতে পারেনি। যতটুকু জানা গেছে, প্রায় ৪০ কোটি বই ডাউনলোড হবে। বইয়ের এমন পিডিএফ এনসিটিবি গুগলের ফ্রি ড্রাইভে আপলোড করেছে, যেখানে প্রতিদিনের ডাউনলোড সীমা (লিমিট) প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কেন এমন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব সরকারি কোনো ‘ক্লাউড সার্ভিস’ (ইন্টারনেট ব্যবহার করে ওয়েব সার্ভারে তথ্য ও প্রোগ্রাম সংরক্ষণ। অনলাইনে থাকা এসব ফাইল যখন-তখন ইচ্ছেমতো খোলার সুবিধা থাকে) ব্যবহার করে পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথের ব্যবস্থা করা, যাতে সবাই সহজেই বইগুলো ডাউনলোড করতে পারে। পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। আরও আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে কন্টেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন) সার্ভিস ব্যবহার করে বিষয়টি খুব ভালোভাবে করা যেত।

.

উৎস: Prothomalo

এছাড়াও পড়ুন:

তিন জেলায় চার শিশু ধর্ষণের শিকার

রাজধানী ঢাকার দারুসসালাম ও মুগদা, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরবে চার শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

দারুসসালামে ধর্ষণের শিকার শিশুটির বাবা জানান, শাহআলী এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকে তাঁর মেয়ে (১৪)। সে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে। সোমবার দুপুরে যুবক মেহেদী হাসান তার বোনের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে যায়। পরে কৌশলে তাকে একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করে।

বাসায় ফিরে মেয়েটি পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানায়। তখন তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিব উল হাসান বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযোগ স্বীকার করেছে সে।

এদিকে মুগদার মানিকনগরে ধর্ষণের শিকার শিশুকে (১২) গতকাল বুধবার দুপুরে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়।

মুগদা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাফায়েত মুকুল বলেন, গত ২৮ মার্চ ওই শিশুকে কৌশলে ভাড়া বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে সাগর। পরে মঙ্গলবার শিশুটির বাবা থানায় অভিযোগ করেন। পুলিশ সাগরকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় ওই শিশুটির বাবা মুগদা থানায় মামলা করেছেন। আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে এক শিশুকে (১০) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত মো. দুলাল মিয়ার (৩০) বাড়ি ভাঙচুর করেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মুক্তাগাছা থানার ওসি মোহাম্মদ কামাল হোসেন।

স্থানীয়রা জানায়, অভিযুক্তকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করায় মজিদকে মারধর করে জনতা। এ সময় মজিদের বাড়ি ও তার ভাই আতিকের দোকান ভাঙচুর করে। মজিদকে ধরে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, নামা মহিষতারা গ্রামের মন্নেছ আলীর ছেলে মো. দুলাল ওই শিশুকে ঈদের দিন বিকেলে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যায়। এ সময় তার মেয়েকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। নিজের মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে ওই শিশুকে এক নির্জন স্থানে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে।

মঙ্গলবার সকালে ওই শিশুকে একটি ভ্যানে করে অসুস্থ অবস্থায় তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। দুলাল তাকে ধর্ষণ করেছে বলে অসুস্থ শিশুটি তার পরিবারকে জানায়। এ সময় পরিবারের লোকজন দুলালকে ধরতে যায়। তাকে কৌশলে ভাগিয়ে দেয় স্থানীয় মজিদ। পরে পুলিশ গিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক ছেলে শিশুকে (৬) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে দুই কিশোরের বিরুদ্ধে। গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টায় পৌর শহরের মেঘনা নদীর পার ডিপোঘাট মুশকিলা হাটি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গতকাল দুপুর ১২টায় শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন ভৈরব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানী। অভিযুক্তদের বয়স কম হওয়ায় তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হলো না।

স্থানীয়রা জানান, শিশুটির বাবা একজন দিনমজুর। ঈদের দিন বাড়ির পাশে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দুই কিশোর তাকে আটকে একটি মসজিদের শৌচাগারে নিয়ে যায়। তার ওপর যৌন নির্যাতন করে। তার চিৎকারে দুই কিশোর পালিয়ে যায়। শিশুটি তার পরিবারের কাছে ঘটনা জানায়। তাকে পরদিন ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কিশোর কুমার ধর বলেন, শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শিশুটির বাবা বলেন, ‘ছেলের রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। পরদিন আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। দুই অভিযুক্তের পরিবারকে ঘটনা জানালে তারা আমাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। তারা এলাকার প্রভাবশালী। ঘটনার পর থেকে আমরা পরিবার নিয়ে আতঙ্কে রয়েছি।’

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নিলুফা ও রাজিব মিয়া বলেন, অভিযুক্তদের ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারছে না।

অভিযুক্ত এক কিশোরের বাবা কারণ মিয়া বলেন, ‘আমার ছেলেকে শত্রুতা করে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমার ছেলে অপরাধ করেনি। যদি অপরাধ করে থাকে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।’

ভৈরব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানী বলেন, ‘ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সম্পর্কিত নিবন্ধ