বাহারি পোশাকে আনন্দ–উল্লাস করছে তরুণ–তরুণীর দল। রাতভর চলছে তাঁদের উদ্যাপন। দিনে নয়; রাতেই বরং শহরটি বেশি প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। সব শুনে মনে হতে পারে ইউরোপ অথবা আমেরিকার কোনো শহর হবে হয়তো। কিন্তু রাতভর পার্টি আর নির্ঘুম রাতের এই শহরের অবস্থান আফ্রিকায়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার সবচেয়ে বড় এ শহরের নাম লাগোস।
শীতকালে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় একটি স্থান হয়ে উঠছে লাগোস। উৎসব, সৈকতে পার্টির পাশাপাশি ফ্যাশন অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে দিন দিন লাগোস হয়ে উঠেছে উদ্যাপনের এক নগরী। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির প্রথমার্ধে পর্যটকদের যেন ঢল নামে সেখানে। এ সময়কাল ‘ডেটি ডিসেম্বর’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
লাগোসে অনুষ্ঠান আর আয়োজন সব সময় লেগেই থাকে। এসব অনুষ্ঠানে আফ্রিকার প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীদের পাশাপাশি হামেশাই বিভিন্ন দেশ থেকে শিল্পীরা যোগ দেন। শুধু বদ্ধ জায়গাতেই থেমে থাকে না এ উৎসব-উদ্যাপন। ডিসেম্বর এলেই দেখা যায়, শহরটির সড়কগুলোতে রঙিন পোশাকে গান ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে হাজারো মানুষ আনন্দ–উল্লাস করছেন।
নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছেন সিনথিয়া এনিওলা। তবে ডিসেম্বর এলেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হতে তিনি ছুটে যান লাগোসে। সিনথিয়া বলেন, ‘জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া আমার কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডিসেম্বরে। কারণ, এই সময়ে সেখানে প্রত্যেকেই নানা উৎসব আয়োজনে যোগ দেন। এমন কোনো মানুষ পাওয়া যায় না, যাঁরা উৎসবে যুক্ত হন না।’
শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর পর্যটক বা প্রবাসী নাইজেরিয়ানরাই নন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের একটি অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে লাগোস। জিনিসপত্রের দাম কম ও থাকা–খাওয়ার খরচ কম হওয়ায় লাগোসে যাওয়ার জন্য পর্যটকদের আগ্রহও বেশি।
ডেটি ডিসেম্বর এখন আর কোনো মামুলি উৎসবের মৌসুমে আটকে নেই। সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে দিনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছে লাগোস।
লাগোসের উদ্যাপনের নগরী হয়ে ওঠার নেপথ্যে নাইজেরিয়ার জনমিতির বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) দেওয়া হিসাবে, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৩ ভাগের ২ ভাগের বয়স ২৫ বছরের কম। যেসব দেশে তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তার একটি হলো নাইজেরিয়া।
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
সাতছড়ি উদ্যানে পর্যটকের ঢল
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের ঢল নেমেছে। তারা উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করে মুগ্ধ হচ্ছে। এভাবে পর্যটকের ঢল আরো কয়েকদিন থাকবে বলে মনে করছে উদ্যান কর্তৃপক্ষ।
এ উদ্যানের ভেতরে রয়েছে অন্তত ২৪টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস। রয়েছে বন বিভাগের লোকজন। পর্যটকদের জন্য চালু আছে প্রজাপতি বাগান, ওয়াচ টাওয়ার, হাঁটার ট্রেইল, খাবার হোটেল, রেস্ট হাউস, মসজিদ, রাত যাপনে স্টুডেন্ট ডরমিটরি। উদ্যানে দুই শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, জামরুল, সিধা জারুল, আওয়াল, মালেকাস, আকাশমনি, বাঁশ, বেত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তুর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর। আরো আছে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি। রয়েছে লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, উল্লুক, ভাল্লুক, চশমাপরা হনুমান, শিয়াল, কুলু বানর, মেছো বাঘ, মায়া হরিণের বিচরণ। সরীসৃপের মধ্যে আছে নানা জাতের সাপ। কাও ধনেশ, বন মোরগ, লাল মাথা ট্রগন, কাঠঠোকরা, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা, শালিক, হলদে পাখি, টিয়া প্রভৃতির আবাসস্থল এই উদ্যান।
সাতছড়ি উদ্যানের কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা সন্ধ্যা রাণী দেববর্মা জানান, ঈদে পর্যটক বরণে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল সাতছড়ি উদ্যান। এ লক্ষ্যে কাজ করা হয়েছে। রয়েছে নিরাপত্তা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পর্যটকরা এসে ঘুরাঘুরি করে মুগ্ধ হচ্ছেন।
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মামুনুর রশিদ জানান, সাতছড়িতে প্রচুর বন্যপ্রাণী রয়েছে। রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। মনোরম প্রাকৃতি পরিবেশে ঘুরে পর্যটকরা আনন্দিত। ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তা মনিটরিং করা হচ্ছে। পরিষ্কার করা হয়েছে বসার আসনগুলো। পর্যটকরা উদ্যানের এমন পরিবেশে মুগ্ধ হচ্ছেন।
তিনি জানান, ঈদের দিন প্রবেশ ফি বাবদ ১ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা ও পর দিন ৮৯ হাজার ৯৩০ টাকা রাজস্ব এসেছে। এভাবে আরো কয়েক দিন চলবে বলে মনে করছেন তিনি।
সাতছড়িতে প্রতিদিন ৩০০ থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত পর্যটক আসেন। উদ্যানে প্রবেশে প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিট ১১৫ টাকা ও অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ৬০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ১ হাজার ১৫০ টাকা। শুটিংয়ের জন্য ১৩ হাজার ৮০০ টাকা। পিকনিক পার্টির জন্য জনপ্রতি ২৩ টাকা। পার্কিংয়ের জন্য ছোট গাড়ির ফি ১১৫ টাকা ও বড় গাড়ি ফি ২৩০ টাকা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল জানান, বর্তমানে পর্যটকদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এ উদ্যানে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পর্যটকদের অবস্থান লেগে থাকে। কারণ এখানে সহজে আসা যায়। উদ্যানের গভীর অরণ্যে দেখা যাচ্ছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। আশপাশে রয়েছে চা বাগান। পাশে তেলিয়াপাড়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। উদ্যানে রয়েছে থাকা-খাওয়ার সু-ব্যবস্থা। রয়েছে নিরাপত্তা।
তিনি জানান, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের পাশাপাশি রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পর্যটক সমাগম বাড়ছে। ঈদে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সাজানো হয়েছে উদ্যানে অবস্থিত দোকানগুলো।
উদ্যানে আসা পর্যটক অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য শামীম আহমেদ জানান, পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নিয়ে এসে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। উদ্যানের পরিবেশ তাদের মুগ্ধ করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা পর্যটক শাহিন মিয়া, পারুল আক্তার, রুবেল মিয়া, বাবলি সরকার উদ্যান ঘুরে তাদের ভালো লাগার কথা জানান। দেশের নানা প্রাপ্ত থেকে শত শত পর্যটক এ উদ্যানে এসে মুগ্ধ হচ্ছে। পর্যটকের নিরাপত্তায় পুলিশের টহল রয়েছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদের নেতৃত্বে বনরক্ষীরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। সাতছড়ি উদ্যান ছাড়াও জেলার বিভিন্ন চা ও রাবার বাগান এবং দর্শনীয় স্থানে পর্যটকরা পরিদর্শন করে মুগ্ধ হচ্ছে।
ঢাকা/মামুন/বকুল