গাজীপুরের টঙ্গীতে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও বিএনপির নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একাংশ দখল করে সমাবেশ করেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মীরা। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় টঙ্গীর কলেজ গেট এলাকায় মহাসড়কটির ময়মনসিংহমুখী লেন দখল করে এ সমাবেশ করেন তাঁরা।

সমাবেশের কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে যান চলাচল। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।

আহসান উল্লাহ মাস্টার আওয়ামী লীগ নেতা ও টঙ্গীর সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ৭ মে স্থানীয় নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে প্রকাশ্যে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার রায় ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ঘোষণা করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। রায়ে মামলার আসামি বিএনপির নেতা নূরুলসহ ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। এর পর থেকেই কারাগারে রয়েছেন তিনি।

মামলাটি মিথ্যা ও ষড়ন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়ে নুরুল ইসলামের মুক্তির দাবিতে আজ শনিবার নুরুল ইসলাম সরকার মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। এতে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার, শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি সালাহ উদ্দিন সরকার, নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে সরকার শাহনুর ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে যোগ দেন টঙ্গী ও আশপাশের এলাকার কয়েক হাজার নেতা–কর্মী। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে শেষ হয় সমাবেশ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, নুরুল ইসলাম সরকার জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সেসব সহ্য করতে না পেরে ২০০৪ সালে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁকে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় ফাঁসায়। সেই মামলার জেরে ২০ বছর ধরে তিনি জেল খাটছেন। তাই তাঁরা যেকোনো মূল্যে নুরুল ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি চান। কিন্তু তারপরও মুক্তি না পেলে আরও কঠোর আন্দোলনে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।

শাহনূর বলেন, ‘আমার বাবা সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ। তারপরও বিনা অপরাধে ২০ বছর ধরে জেল খাটছেন। বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আশা করছি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমরা ন্যায়বিচার পাব, আমার বাবা মুক্তি পাবে।’

হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমরা এমন একটা দিনের অপেক্ষায় ছিলাম, যেদিন তাঁর (নুরুল ইসলাম সরকার) মুক্তির দাবিতে কথা বলতে পারব। আজ সেই দিন এসেছে। তিনি এখনো মুক্তি না পেলেও, আমি মনে করি তিনি মুক্তি পেয়ে গেছেন। কারণ, আজ তাঁর ডাকে, তাঁর মুক্তির দাবিতে হাজার হাজার জনগণ সাড়া দিয়েছেন। আমি আজকের এই সমাবেশ থেকে ওই মিথ্যা মামলার পুনরায় তদন্তের দাবি করছি।’

বেলা সাড়ে ১১টায় সরেজমিনে দেখা যায়, সমাবেশ উপলক্ষে কলেজ গেটে সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি অ্যান্ড কলেজের সামনের ফুটপাতে (ময়মনসিংহমুখী লেনের পাশে) স্থাপন করা হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চে অবস্থান করছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। আর সড়কে অবস্থান নিয়েছেন কয়েক হাজার নেতা–কর্মী। তাঁদের কারও হাতে ব্যানার, ফ্যাস্টুন। কেউবা এসেছে প্ল্যাকার্ড নিয়ে। নেতা–কর্মীদের অবস্থানের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল। এতে দেখা দিয়েছে ভোগান্তি। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ হেঁটেই রওনা দেন গন্তব্যে।
কথা হয়, চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা মো.

জিসানের সঙ্গে। তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাশিশু নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন চৌরাস্তার দিকে।

জিসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা টঙ্গীবাজার থেকে বাসে উঠছি। কিন্তু স্টেশনরোড পর্যন্ত আসতেই যানজট শুরু হয়।  প্রায় এক ঘণ্টা বাসে বসে থেকে হেঁটেই রওনা দিই বাড়ির উদ্দেশে।’

জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (টঙ্গী জোন) এন এম নাসিরুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে সমাবেশ করার ব্যাপারে তাঁদের (বিএনপির নেতা–কর্মী) কোনো অনুমতি ছিল না। তারপরও তাঁরা সমাবেশ করলে মানুষের ভিড়ে যান চলাচলে সমস্যা হয়। আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য।’

সে ক্ষেত্রে নিষেধ বা বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, বাধা দেওয়ার উপায় ছিল না। বাধা দিলে মারামরি বাধত।

উৎস: Prothomalo

এছাড়াও পড়ুন:

শোলাকিয়ায় ১৯৮তম ঈদের জামাত, ৫ লক্ষাধিক মুসুল্লীর নামাজ আদায়

এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ-উল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হলো কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়ায়। পাঁচ লক্ষাধিক মুসুল্লীর অংশগ্রহণে ১৯৮তম ঈদের জামাতে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ছিল পরিপূর্ণ। 

কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে মাঠের ভেতরের কাতার উপচে বাইরেও কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় ঈদগাহ ময়দান। নামাজ শেষে মোনাজাতে বিশ্বশান্তি ও দেশের সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া করা হয়। 

সোমবার (৩১ মার্চ) ভোরের আলো ফোটার আগেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয় শোলাকিয়া ও আশাপাশের এলাকা। চার স্তরের অধিক নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে মুসল্লিদের ঢুকতে হয় ঈদগাহ মাঠে। সকাল ৯টার আগেই জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে জামাতে ছাতা, লাঠিসোটা, দিয়াশলাই কিংবা লাইটার নিয়ে মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। বড় জামাতে অংশ নিলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়-এমন বিশ্বাস থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে। 

এদিন সকাল ১০টায় ঈদ-উল-ফিতরের জামাত শুরু হয়। এতে ইমামতি করেন ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে রাজনৈতিক কারণে ইমামতি থেকে বাদ দেওয়া হয় তাকে। এবার নতুন করে আবার পুনর্বহাল করায় তিনিও অন্যন্ত আনন্দিত।

মুসল্লিদের ঢল শুরু হয় ভোর থেকেই। ঈদগাহমুখী সব রাস্তাঘাটে কয়েক ঘণ্টার জন্য যান চলাচল বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জামাত শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই সাত একর আয়তনের শোলাকিয়া মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। অনেকে আবার মাঠে জায়গা না পেয়ে পার্শ্ববতী রাস্তা, তিনপাশের ফাঁকা জায়গা, নদীর পাড় ও আশপাশের বাসাবাড়ির ছাদে উঠে জামাতে শরিক হয়েছেন।

অন্যদিকে নারীদের জন্য শহরের সরযূবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পৃথক ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়। সেখানেও বহু নারী ঈদ জামাতে অংশ নেন।

নামাজ শুরুর আগে মুসল্লিদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী।

কুমিল্লা থেকে এবারই প্রথম এ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন কবির উদ্দিন ভূইয়া (৫৩)। তিনি গত রাতেই এসেছেন, উঠেছেন একটি আবাসিক হোটেলে। 

তিনি বলেন, “বহু বছর ধরে এ মাঠের সুখ্যাতি শুনে আসছি। এবার আল্লাহ দরবারে নিয়ত করেছিলাম, তিনি আমার আশাপূর্ণ করেছেন। খুব ভালো লাগলো এখানে এসে। লাখ লাখ মুসুল্লীর সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।”

মাঠের সুনাম ও নানা জনশ্রুতির কারণে ঈদের কয়েক দিন আগেই কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। এদের অনেকেই উঠেছিলেন হোটেলে, কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ও শোলাকিয়া ঈদগাহ মিম্বরে।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রহমত ব্যাপারী (৬৫)। ভোরে পরিবারের পাঁচজনকে সাথে ট্রেনযোগে পৌছান শোলাকিয়া মাঠে। প্রতিবছরই তারা এ মাঠে ঈদের জামাতে অংশ নেন। তিনি বলেন, “রোদ-বৃষ্টি বুঝি না। শুধু জানি যতদিন বেঁচে আছি-এখানে আসতেই হবে। এখানে এলে অন্যরকম এক শান্তি খুঁজে পাই। বড় জামাতে নামাজ আদায় করলে আল্লাহতালা মনের আশাও পূরণ করেন।”

দূর-দূরান্তের মুসুল্লিদের যাতায়াতের জন্য শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি ট্রেন চালু ছিল। ময়মনসিংহ ও ভৈরব থেকে এ দুটি বিশেষ ট্রেন সকালে জামাতের আগে কিশোরগঞ্জে পৌঁছায়। এছাড়া মুসল্লিদের ওজু ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা, মেডিক্যাল টিম, ফায়ার সার্ভিসসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা ছিল শোলাকিয়া মাঠে। 

কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী (বিপিএম) জানান, ২০১৬ সালে শোলাকিয়ায় জঙ্গী হামলার কথা মাথায় রেখে মাঠে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জামাতের সময় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, আনসার সদস্যের সমন্বয়ে নিরাপত্তা বলয়ের পাশাপাশি মাঠে সাদা পোশাকে নজরদারি ছিল বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার।

নিরাপত্তার কাজে প্রথমবারের মতো এবার যুক্ত ছিল সেনাবাহিনীও। মাঠে ছিল ড্রোন ও মাইনো কোলারসহ ভিডিও ক্যামেরা। মাঠ ও শহরসহ প্রবেশ পথগুলো সিসি ক্যামেরা দিয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়া মাঠে ছিল ছয়টি ওয়াচ। সেখান থেকে দূরবীন নিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। 

নামাজ শুরু করার সঙ্কেত হিসেবে রেওয়াজ অনুযায়ী শোলাকিয়ার ঈদ জামাত শুরুর পাঁচ মিনিট আগে শটগানে তিনটি, তিন মিনিট আগে দুটি ও এক মিনিটি আগে একটি গুলির আওয়াজ করা হয়।

জনশ্রুতি রয়েছে, শোলাকিয়ার সাহেববাড়ির সুফি সৈয়দ আহম্মদ ১৮২৮ সালে তার নিজ জমিতে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ঈদের প্রথম জামাতে তখন সোয়া লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। পরে উচ্চারণ বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া এবং সেখান থেকে শোলাকিয়া শব্দটি প্রচলিত হয়েছে।

ঢাকা/রুমন/এস

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • নেত্রকোনার দুই উপজেলায় গ্রামবাসীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত ৮৫
  • ঈদের ছুটিতে চারদিনে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৪৬ জনের
  • ঈদের ছুটিতে চার দিনে প্রাণ গেল ৪৬ জনের
  • মুক্তাগাছায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্তের বাড়িঘর ভাঙচুর
  • মুক্তাগাছায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্তের বাড়িঘর ভাঙচুর উত্তেজিত জনতার
  • ময়মনসিংহে প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় সিনেমা হলে দর্শকদের ভাঙচুর
  • বেড়াতে নিয়ে শিশুকে ধর্ষণ, অভিযুক্তের বাড়িতে জনতার ভাঙচুর-অগ্নিসংয
  • বাকিতে গরুর মাংস বিক্রি না করাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫
  • কয়েক লাখ মুসল্লির সমাগমে জনসমুদ্র শোলাকিয়া, শান্তি কামনা করে মোনাজাত
  • শোলাকিয়ায় ১৯৮তম ঈদের জামাত, ৫ লক্ষাধিক মুসুল্লীর নামাজ আদায়