২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশে। দ্বিতীয় প্রান্তিকেও যে এ হার তেমন একটা বাড়বে, তার লক্ষণ নেই। সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানেই এ চিত্র উঠে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, অর্থবছরের প্রথম চার মাসের শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ হার গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শুধু তা–ই নয়, এ সময় শিল্পের প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই-নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি কমার অর্থ, দেশে নতুন বিনিয়োগ কমেছে। ২০২৩ সালের জুলাই-নভেম্বরের তুলনায় ২০২৪ সালের একই সময়ে ভোগ্যপণ্য আমদানির ‘এলসি সেটেলমেন্ট’ কমেছে ১৩ শতাংশ।

সরকারের পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে এনবিআর গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬২ শতাংশ কম রাজস্ব আহরণ হয়েছে; আগের বছর একই সময়ে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ।

এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৬৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আগের নেওয়া ঋণের ৫৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নেয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৮ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে সেটা ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা।

আরেকটি খবর হলো, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত সঞ্চয় কর্মসূচিগুলোর (স্কিম) মুনাফার হার বাড়ানো হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের ধরন অনুযায়ী সুদহার হবে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে আরও বেশি অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে।

এসব পরিসংখ্যান দেওয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পণ্যে ভ্যাট বৃদ্ধি করেছে, তার কারণ অনুসন্ধান। বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকার ভ্যাট বাড়িয়েছে। সে কারণের পাশাপাশি মূল বিষয় হলো, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস (জুলাই-অক্টোবর) সময়ে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। এমনকি আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় তা কমেও গেছে।

বাস্তবতা হলো, পৃথিবীতে যেসব দেশের কর-জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। গত ১৫ বছরে দেশের জিডিপি কয়েক গুণ হলেও রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত বাড়েনি, বরং কমেছে। এর মধ্যে আবার প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের অনুপাত কম। সে জন্য ভ্যাট বাড়িয়ে ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা। কিন্তু সমস্যা হলো, ভ্যাট ধনী-গরিব সবার জন্যই সমান। ভ্যাট বৃদ্ধি করে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অন্যায্য। কোভিড শুরু হওয়ার পর থেকে এ সমস্যা প্রকট হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে তা আরও তীব্র হয়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপদ বেড়েছে। আইএমএফের ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ কর্মসূচির শর্তের কারণে সরকারের ভর্তুকি কমানো হচ্ছে। এতেই চাপে পড়ছে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। কর ফাঁকির টাকা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেশে থাকে না, পাচার হয়ে যায়। প্রভাবশালীদের কর ফাঁকি বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ নেই বলা যায়। বরং বারবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার কর ফাঁকিতে একরকম উৎসাহ দিয়ে আসছে। এ ছাড়া রয়েছে নানা ধরনের করছাড়। এসব ছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব অনেকটা কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি গবেষণায় দেখা গেছে, আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমেই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়। সব মিলিয়ে একদিকে বাংলাদেশ রাজস্ব আদায় করতে পারছে না, অন্যদিকে রাজস্ব ফাঁকিও ঠেকাতে পারছে না।

এ পরিস্থিতিতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে নিম্ন প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা। এত দিন উচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যে কর ফাঁকির প্রবণতা যতটা টের পাওয়া যেত, এখন নিম্ন প্রবৃদ্ধির মধ্যে তা আরও বেশি টের পাওয়া যাবে। যাকে বলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতাও কম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় হচ্ছে জিডিপির ১৩ শতাংশ। ভারতে এই হার ২৮ দশমিক ৮, ভিয়েতনামে ২০ দশমিক ৪, মালয়েশিয়ায় ২২ দশমিক ৩, যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যয় ৩৬ দশমিক ৮, সুইডেনে ৪৯ দশমিক ৪ আর ফ্রান্সের সরকারি ব্যয় জিডিপির তুলনায় ৫৭ শতাংশ।

সংস্কার কার্যক্রম

২০২৪ সালে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। গত ১৫ বছরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক খাত। এই খাতের সংস্কারে জোর তৎপরতা চলছে। কিছু ফলও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের কাছাকাছি চলে গেছে। বেড়েছে রিজার্ভ, যদিও এর সঙ্গে আমদানি কমে যাওয়ার যোগ আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি হচ্ছে না। প্রথমত, সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রভাব পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু উৎপাদনমুখী কারখানা। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি, সেটা হলো আস্থা; কিন্তু সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সে আস্থায় চিড় ধরেছে। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে না।

দেশে অনেক দিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়িয়েই যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে ঋণের সুদহার, যদিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বিশ্লেষকেরা বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে রাজস্ব নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। একদিকে নীতি সুদহার বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পণ্যের ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে; এ বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধির গতি যেমন কমে যাবে, তেমনি মূল্যস্ফীতিও কমবে না। এ জন্য অর্থনীতিতে স্ট্যাগফ্লেশন (উচ্চ মূল্যস্ফীতি + নিম্ন প্রবৃদ্ধি + উচ্চ বেকারত্ব) তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির জন্য কিছুটা মূল্যস্ফীতি প্রয়োজন। কিন্তু এখন মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হলেও প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেকারত্বের সমস্যা। দেশে গত এক দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থান হয়নি। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন। তাঁদের ভাষ্য, এটা ছিল কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। এখন প্রবৃদ্ধির হার দুইয়ের নিচে নেমে এসেছে। এ বাস্তবতায় কর্মসংস্থান পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ঢাকা মহানগরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য দেখে বেকারত্ব পরিস্থিতির বাস্তবতা বোঝা যায়।

ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমলে বাজারে জোগান কমে দাম বেড়ে যায়—এটাই অর্থনীতির চিরাচরিত সূত্র। অন্যদিকে মূলধনি ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমলে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সক্ষমতা কমে যায়। এ সবকিছুর প্রভাব পড়ে প্রবৃদ্ধির ওপর; বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি অর্থবছরে যা ৪ শতাংশে নামবে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ; এমনকি পরিসংখ্যানগত সংশোধন (আগের সরকারের বিরুদ্ধে পরিসংখ্যান বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ ছিল) সত্ত্বেও এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নিম্ন বিনিয়োগ ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে তা কতটা অর্জনযোগ্য, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

মোদ্দাকথা হলো, অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে আসার মতো পদক্ষেপ অন্তর্বর্তী সরকার এখনো নেয়নি। আগে রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে যেভাবে ধনীদের তোষণ করার নীতির সমালোচনা হতো, শতাধিক পণ্যে ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও সেই প্রকৃতির, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সংস্কার পিছিয়ে যাচ্ছে বলেই দেখা যাচ্ছে।

.

উৎস: Prothomalo

এছাড়াও পড়ুন:

বাড়ছে আমদানিনির্ভর কৃষিপণ্যের উৎপাদন

আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ছিল বেশি। চাহিদার বাড়তি আলু রপ্তানি হতো বিশ্বের ১৬টি দেশে। তিন বছর আগে দুই লাখ টন আলু রপ্তানির রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। আলু রপ্তানির এসব গল্প ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যায়। কারণ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাহিদা মেটাতে প্রথমবারের মতো ৯৮ হাজার ৭৩১ টন আলু আমদানি হয়। শুধু আলু নয়, কাঁচামরিচ, টমেটো, গাজর, পেঁয়াজ, সবজিসহ বেশ কিছু কৃষিপণ্য গত দেড় দশকে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে যায়। কমে রপ্তানি। তবে এবার আলুর এত বাম্পার ফলন হয়েছে যে, হিমাগারে রাখার জায়গা নেই। এতে কৃষক দুর্ভোগে পড়লেও ভোক্তা আছেন স্বস্তিতে। বাজারে আলুর দাম কমার কারণে বাড়ছে রপ্তানি। চলতি অর্থবছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সাড়ে সাত মাসে ২৪ হাজার টন আলু রপ্তানি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। এটি গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। গত ফেব্রুয়ারিতে  প্রায় ১২ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের মোট রপ্তানির সমান।

অন্যদিকে পেঁয়াজে দীর্ঘদিনের ভারতনির্ভরতা কমতে শুরু করেছে। প্রতিবছর দেশে প্রায় ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হতো। এবার যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে, তাতে কৃষক ন্যায্য মূল্য পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। দেশে বছরে শস্যটির চাহিদা ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। এবার চাহিদার চেয়ে এটি বেশি উৎপাদনের আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
শুধু আলু, পেঁয়াজ নয় সবজি উৎপাদনে এবার রেকর্ড ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এবারের রোজা স্বস্তিতে কাটিয়েছেন ভোক্তা। এ বাস্তবতার বিপরীতে রপ্তানিতে আশা জাগাচ্ছে কৃষিপণ্য। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি আয় ৮ শতাংশ বেশি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছে ১০ শতাংশের মতো। কৃষি মন্ত্রণালয় এখন আমদানিনির্ভর ফসল উৎপাদন বাড়াতে জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে তেল, দানা ও মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা।

মসলাজাতীয় ফসল
দেশে হলুদ, মরিচ, মৌরি, মেথি, কালিজিরা, তেজপাতা, আদা-রসুন-পেঁয়াজ, সরিষা, ধনিয়াসহ অধিকাংশ গরম মসলার বাজার আমদানিনির্ভর। ফলে আমদানি স্বাভাবিক না থাকলে দেশের বাজারে পণ্যগুলোর দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বিশ্বের ১০৯ ধরনের মসলার মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে ৪৪টি। দেশে চাষ হচ্ছে মাত্র ৩৪টি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের মসলা ফসলের উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয় কমাতে ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ এলাকা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং সংরক্ষণ প্রযুক্তির ওপর মানসম্মত প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রমের ফলে আমদানির পরিমাণ বেশ কমছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি হয় ৭ দশমিক ৪৩ লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ছয় লাখ টনের সামান্য বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সম্প্রসারণ উন্নত জাত ও নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ বস্তায় আদা চাষ করা হয়। এতে ৯ হাজার টন আদা উৎপাদন হয়েছে। শতভাগ আমদানিনির্ভর জিরা মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। বীজ সংরক্ষণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রতিবছর জিরাতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আমদানি ব্যয় হয়। এ ছাড়া রসুনে আগের তুলনায় বার্ষিক আমদানি কমেছে প্রায় দুই হাজার টন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার মসলার বাজার আছে। তবে এ মসলার চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ হচ্ছে বিদেশ থেকে আনার মাধ্যমে। 
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, ‘আমরা মসলার আমদানি নির্ভরতা কমাতে কাজ করছি। উন্নত জাতের মসলা ফসলের বছরব্যাপী উৎপাদন বাড়ানো হবে। আমদানি ব্যয় কমাতে এবং মসলাজাতীয় ফসল চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গতিশীলতা আনতে মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ধান, গম বা অন্য শাকসবজির চেয়ে মসলার দাম বেশি। এটা দীর্ঘসময় রেখে দেওয়া যায়। ফলে কৃষকরা যখন দেখবে, এটা লাভজনক এবং অল্প জায়গায় চাষ করতে পারছেন, তখন অবশ্যই এটার উৎপাদন বাড়বে।’ 
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ২২টি মসলাজাতীয় ফসলের ওপর মোট ৪৭টি জাত উদ্ভাবন হয়েছে। তা ছাড়া উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে উৎপাদন প্রযুক্তি, মৃত্তিকা ও পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তিসহ আরও ৬৬টি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে। এসব জাত ও প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ হলে একদিকে বাড়বে উৎপাদন, অন্যদিকে কমবে সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির পরিমাণ। আয়ুর্বেদিক, খাদ্য এবং শিল্পে মসলার ব্যবহার বাড়বে বহুগুণ।

তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে বিপ্লব
দেশে প্রায় সময় ভোজ্যতেলের দাম ও সরবরাহের ঘাটতি নিয়ে হইচই পড়ে। প্রতিবছর রমজানে এ শোরগোল আরও বাড়ে। চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন কম হওয়ার বিপরীতে অতিমাত্রার আমদানির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চাহিদার ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি হয়। এতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন তথ্য বলছে, এ খাতে বছরে ব্যয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
এমন অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয় ভোজ্যতেলের দেশেই উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য ভোজ্যতেলের স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে ডলার সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশেই সরিষা, তিল, বাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখীসহ সব ধরনের তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানি চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনতে চায় সরকার, যার কার্যক্রম শুরু হয় ২০২২ সালে। লক্ষ্য অর্জনের এ দৌড়ে মাঠপর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাত্র দুই বছরেই পৌঁছে গেছে ২৫ শতাংশের দ্বারপ্রান্তে। অন্যদিকে আমদানি হিসাব বলছে, এতে দেশের ২৭ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি কমেছে। 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতে ২০২২ সাল থেকে তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন অধিদপ্তরগুলো। এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে দেশে দুই লাখ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ বাড়ানো হয়েছে। উৎপাদন বেড়েছে আগের তুলনায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার টন। তেলের হিসাবে বিবেচনা করলে ১ লাখ ২১ হাজার টন তেল বেশি উৎপাদন হয়েছে। আর প্রতি লিটার তেলের মূল্য ২৫০ টাকা হিসাব করলে এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার, যা কমিয়েছে আমদানি ব্যয়ের চাপ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, তিন বছর আগেও দেশে সরিষা উৎপাদিত হতো প্রায় ছয় লাখ টন। কিন্তু এখন দেশে গড়ে প্রতিবছর ১৭ লাখ টন সরিষা উৎপাদন হচ্ছে, যা থেকে প্রায় ছয় লাখ টন তেল উৎপাদিত হয়। এটি দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ২৫ শতাংশ। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের উৎপাদন মৌসুম শেষে সরিষা, তিল, বাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখীসহ তেলজাতীয় ফসলের আবাদ তিন গুণ বেড়ে ৮ লাখ ৬০ হেক্টর জমি থেকে ২৩ লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে উন্নীত করা হবে। এতে তেলের উৎপাদনও একই হারে বাড়বে।

দানাদার খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড
দেশে গত বছর দানাদার খাদ্যের উৎপাদনে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ধান, গম, ভুট্টা মিলিয়ে মোট উৎপাদিত হয়েছে ৬ লাখ ৪৩ হাজার টন। বন্যা-ঘূর্ণিঝড়সহ নানা দুর্যোগ সত্ত্বেও এ বছর বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে যে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টন দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়েছে, এর মধ্যে ধানই ৫ কোটি ৮৬ লাখ টন; ভুট্টা ৪৭ লাখ টন। আর গম ১১ লাখ টন উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশে মোট দানাদার খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড।
এফএওর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে ৬ কোটি ৯ লাখ ২১ হাজার টন দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৬ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার টন। গত এপ্রিলে গম ঘরে তুলেছেন কৃষকরা। এবার ১১ লাখ টন গম উৎপাদন হয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমরা তো শুধু ভাত খেয়ে বেঁচে থাকি না। শস্যজাতীয় খাদ্যের উৎপাদন ভালো হলেও অন্য সব পণ্যই আমদানি করতে হয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে দীর্ঘ পরিকল্পনার প্রয়োজন। এখানে প্রতিনিয়ত আবাদি জমি কমছে। বিপরীতে জনসংখ্যা বাড়ছে। তাই বিপুল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব কৃষিপণ্য আমরা সহজে উৎপাদন করতে পারি, সেসবের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য চালিয়ে যেতে হবে গবেষণা। যেসব পণ্য সহজে উৎপাদন হবে না, তার জন্য আমদানির পথও খোলা রাখতে হবে। আলুর মতো যেসব পণ্যের উৎপাদন বেশি হয়, সেসব পণ্য রপ্তানির ব্যবস্থা করা যায়।’

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • ভারতের অর্থনীতিতে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আরেকটি পূর্বাভাস
  • মদ বিক্রিতে আয় ৫ হাজার কোটি, দুধ বিক্রিতে মাত্র ২১০ কোটি রুপি আয়
  • শুল্কমুক্ত সুবিধার সুফল কম, চীনে রপ্তানি হয় আমদানির ৩১ ভাগের ১ ভাগ
  • বাড়ছে আমদানিনির্ভর কৃষিপণ্যের উৎপাদন