মুন্সিগঞ্জে থানাহাজত থেকে গ্রেপ্তার যুবদল নেতাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা
Published: 10th, January 2025 GMT
মুন্সিগঞ্জে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার এক যুবদল নেতাকে থানাহাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন বিএনপি ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা। শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) রাত ১০টার দিকে জেলার শ্রীনগর থানায় এ ঘটনা ঘটে।
থানা থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ওই আসামির নাম তরিকুল ইসলাম। তিনি শ্রীনগর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও থানা সূত্রে জানা যায়, মারামারির ঘটনায় গত ১৯ নভেম্বর শ্রীনগর থানায় একটি মামলা হয়। মামলাটি নেওয়ার জন্য মুন্সিগঞ্জ আদালত থেকে পুলিশকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন তরিকুল ইসলাম। শুক্রবার সন্ধ্যায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে থানাহাজতে রাখে। রাত ১০টার দিকে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে আসামি তরিকুলকে হাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যান বিএনপির নেতা–কর্মীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, তরিকুলকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে প্রথমে থানায় আসেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম খান, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মৃধা, সদস্যসচিব মামুনুর রশিদ, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক এমদাদুল হক, ছাত্রদলের সভাপতি আশরাফুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন। তাঁরা তরিকুলকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশকে বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকেন। পুলিশ তাতে রাজি না হলে হাফিজুল ইসলাম খান সন্ধ্যা সাতটার দিকে অন্য নেতা–কর্মীদের থানায় রেখে তিনি বেরিয়ে যান।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এর কিছুক্ষণ পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা থানা প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন। প্রায় ২০০ নেতা–কর্মী থানা প্রাঙ্গণে জড়ো হন। সেখানে তাঁরা বিক্ষোভ করতে থাকেন। পুলিশের সঙ্গে তাঁরা বাগ্বিতণ্ডা শুরু করেন। একপর্যায়ে রাত ১০টার দিকে ‘জিয়ার সৈনিক এক হও, লড়াই করো’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে জোর করে ওসি ও সার্কেল এসপির সামনে থেকে আসামি তরিকুলকে ছিনিয়ে নিয়ে যান তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি থানাই যাইনি। আমার বিরুদ্ধে কোনো একটি পক্ষ মিথ্যা দোষারোপ করার চেষ্টা করছে।’ তিনি দাবি করেন, থানা থেকে কোনো আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এমন হতে পারে, যে আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, সে রাস্তা থেকে পালিয়ে গেছে। এখন এটিকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার নাটক সাজানো হচ্ছে। তবে পালিয়ে যাওয়া ওই আসামিকে ধরতে তিনি তাঁর লোকজনদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে কাজে লাগিয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শ্রীনগর সার্কেল) আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিএনপির নেতাদের অনেক বোঝানোর চেষ্টা করি। ভেতরে যাঁরা আমাদের সঙ্গে ছিলেন তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম। তবে বাইরে যাঁরা ছিলেন তাঁরা আমাদের পুলিশ সদস্যদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে আসামিকে লকআপ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন। যাঁরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, আমাদের কাছে সিসিটিভির ফুটেজ রয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। সেই সঙ্গে ছিনিয়ে নেওয়া আসামিকে গ্রেপ্তারের অভিযান শুরু করেছি।’
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
সম্প্রীতির উৎসবে সংঘাত কেন?
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করিয়া সমগ্র দেশে যখন সম্প্রীতির সুর বাজিয়াছে তখন হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুরসহ কতিপয় এলাকায় সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনাবলি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। আমরা জানি, রমজানের রোজার শেষে ‘খুশির ঈদ’ উৎসব উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁহার বহুল শ্রুত সংগীতে ‘দোস্ত’ ও ‘দুশমন’ ভুলিয়া গিয়া সকলের সহিত করমর্দনের তাগিদ দিয়াছেন। কিন্তু তৎপরিবর্তে একের হস্ত অপরের উপর সক্রোধে ক্ষুব্ধ ক্রিয়া করিতেছে কেন? যেই সকল তুচ্ছ ঘটনায় এই সকল সংঘাত ঘটিয়াছে, উহাও কম উদ্বেগজনক নহে।
সমকাল অনলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কতিপয় ব্যক্তি বাণিজ্য উপলক্ষে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করেন। কয়েক দিন পূর্বে তুচ্ছ বিষয় লইয়া তথায় তাঁহাদের মধ্যে হস্তযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। ঈদের ছুটিতে সকলে এলাকায় প্রত্যাবর্তন করিলে মঙ্গলবার উক্ত অঘটন লইয়া সালিশ বৈঠক চলাকালে উভয় পক্ষ লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র সহযোগে পরস্পরের উপর সমর্পিত হয়। ফলে দুই পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হন। একই দিবসে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নের মনসুরাবাদ গ্রাম ও তুজারপুর ইউনিয়নের সরইবাড়ি গ্রামে ‘আধিপত্য বিস্তার’কে কেন্দ্র করিয়া পৃথক দুই সংঘর্ষে আহত ন্যূনপক্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ। অন্যদিকে মঙ্গলবারই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ফুটবল খেলায় বাধা প্রদানকে কেন্দ্র করিয়া দুই পক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যথায় প্রায় ২০ জন আঘাতপ্রাপ্ত হন। ৩০ মার্চ তথা চন্দ্ররজনীতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দোকানের সম্মুখে ব্যাটারিচালিত রিকশা রাখার ন্যায় তুচ্ছ বিষয় লইয়া দুই দলের মধ্যে যেই তুমুল সংঘর্ষ হইল, উহাও বিস্ময়কর।
পল্লি অঞ্চলে প্রভাবশালী পরিবার কিংবা পক্ষসমূহের আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা বহুল আলোচিত। সেই আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষে সংশ্লিষ্ট হইবার ঘটনাও বিরল নহে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সামাজিক কাঠামোতে ইতোমধ্যে বহু পরিবর্তন সাধিত হইলেও সামন্ত যুগের সেই সংঘাত-সংঘর্ষ হইতে বিশেষত পল্লি অঞ্চলসমূহ অদ্যাবধি বাহির হইতে পারে নাই। বরং রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অনেকাংশেই সেই প্রভাবশালীদের স্থান দখল করিয়াছেন। তাহাদের আশীর্বাদপুষ্ট গোষ্ঠীসমূহ তাই বিবিধ অজুহাতে প্রায়শ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। উল্লিখিত ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করিলেও হয়তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে উহার প্রমাণ মিলিবে। কিন্তু ঈদুল ফিতরের ন্যায় সম্প্রীতির উৎসব উদযাপনকালেও যখন এহেন সংঘাত-সংঘর্ষের বিস্তার ঘটে, তখন আমাদের ললাট কুঞ্চিত না হইয়া পারে না। এহেন সংঘাত-সংঘর্ষে স্পষ্ট– ধর্মীয় বিধিবিধান তো দূরস্থান, উৎসবের মিলনাত্মক আমেজও উহাদের নিরস্ত করিতে পারিতেছে না।
আমরা জানি, ঈদ মানেই এমন এক উৎসব, যখন সকল প্রকার সামাজিক ব্যবধান-বৈষম্য অতিক্রম করিয়া মুসলমান সমাজ সমভিব্যাহারে আনন্দে মাতিয়া উঠে। এমনকি ধর্ম-বর্ণের ব্যবধানও এই সময়ে ঘুচিয়া যায়। অর্থাৎ ঈদুল ফিতর এমন এক উপলক্ষ লইয়া আসে যখন সমাজের সকল মানুষের একাট্টা হইবার অবকাশ সৃষ্টি হয়। সেই সময়ে যখন আলোচ্য সংঘর্ষের ন্যায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলি ঘটে তখন বুঝিতে হইবে, সমাজের মধ্যে কোনো না কোনো ব্যাধি দানা বাঁধিয়াছে। ইহার সুচিকিৎসা না হইলে এই সকল উৎপাত বৃদ্ধিই পাইবে। সুলুক সন্ধান জরুরি– কেন স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমক্ষে এহেন সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটে। হবিগঞ্জের ঘটনায় জানা গিয়াছে, উভয় পক্ষ রীতিমতো ‘অগ্রিম ঘোষণা’ দিয়া সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হইয়াছে। ইহার অর্থ, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে এক প্রকার অবহিত করিয়াই তাহারা এহেন দুষ্কর্মে মনোনিবেশ করিয়াছে। এক্ষণে প্রশ্ন, প্রশাসন ও পুলিশ অগ্রিম ব্যবস্থা গ্রহণ করিল না কেন?